কুরআন পড়া মানে শুধু বাংলা পড়া নয়, কিতাবকে বুঝে পড়া

আলম এম.আলম এম.১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কুরআনকে বুঝতে হলে শুধু বাংলা অনুবাদ পড়ে থেমে গেলে চলে না। কারণ অনুবাদ হলো একটি ভাষা থেকে আরেক ভাষায় অর্থ প্রকাশের প্রচেষ্টা; আর কুরআনের শব্দ, বাক্যগঠন, প্রসঙ্গ ও পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরে না গেলে অনেক সময় একটি শব্দের প্রকৃত তাৎপর্য আড়াল হয়ে যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“যাদের আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই এতে ঈমান আনে।”

— সূরা আল-বাকারা, ২:১২১

এখানে “পাঠ” শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়। কিতাবকে তার যথাযথ পদ্ধতিতে পাঠ, উপলব্ধি ও অনুসরণ করার প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত।

আবার কুরআন নিজেই বলে:

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَلَقَدْ أَنزَلْنَا إِلَيْكَ كِتَابًا فِيهِ ذِكْرُكُمْ ۖ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

“আমি তোমার প্রতি এমন এক কিতাব নাজিল করেছি, যাতে তোমাদের জন্য স্মরণ/উল্লেখ রয়েছে। তবুও কি তোমরা উপলব্ধি করবে না?”

— সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০

তাই কিতাবের বক্তব্য বুঝতে হলে শব্দের ব্যবহার, প্রসঙ্গ এবং কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে তার সম্পর্ক দেখতে হবে।

২৭:৭৫ — কিতাবের সবকিছু সবার কাছে গোপন নয়

কুরআন বলে:

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَمَا مِنْ غَائِبَةٍ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ

“আকাশ ও পৃথিবীতে এমন কোনো গোপন বিষয় নেই, যা একটি সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।”

— সূরা আন-নামল, ২৭:৭৫

এখানে “সবার কাছে গোপন কিছু নেই” এমন বক্তব্য সরাসরি আয়াতের ভাষা নয়। আয়াতটি বলছে, আকাশ ও পৃথিবীর কোনো غَائِبَةٍ (ghā’ibah), অর্থাৎ অদৃশ্য/গোপন বিষয়, সুস্পষ্ট কিতাবের বাইরে নয়।

অর্থাৎ বিষয়টি কিতাবের মধ্যে সংরক্ষিত থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত, প্রত্যেক মানুষের কাছে তার জ্ঞান থাকা আবশ্যক এমন কথা আয়াতটি বলে না।

২৭:৭৬ — قَصَّ এর অর্থ কি “বিকৃত”?

এখানে শব্দতাত্ত্বিক সতর্কতা খুব জরুরি।

পবিত্র কুরআন — বাণী

إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَقُصُّ عَلَىٰ بَنِي إِسْرَائِيلَ أَكْثَرَ الَّذِي هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ

“নিশ্চয়ই এই কুরআন বনি ইসরাইলের কাছে তাদের অধিকাংশ যে বিষয়ে মতভেদ করে, তার বিবরণ/বর্ণনা তুলে ধরে।”

— সূরা আন-নামল, ২৭:৭৬

এখানে يَقُصُّ (yaquṣṣu) এসেছে ق ص ص (qa-ṣa-ṣa) মূল থেকে।

এই মূলের একটি মৌলিক ব্যবহার হলো কোনো বিষয় অনুসরণ করে তার বিবরণ তুলে ধরা, ঘটনা বর্ণনা করা, ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা।

যেমন:

পবিত্র কুরআন — বাণী

فَلَمَّا جَاءَهُ وَقَصَّ عَلَيْهِ الْقَصَصَ

— সূরা আল-কাসাস, ২৮:২৫

অর্থাৎ কোনো ঘটনার কিস্সা/বিবরণ বর্ণনা করা।

তাই ২৭:৭৬-এর يَقُصُّ-কে সরাসরি “বিকৃত করে” অনুবাদ করা হলে শব্দটির কুরআনিক ব্যবহারকে অন্যত্রের প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বরং আয়াতের পরবর্তী অংশই অর্থটি স্পষ্ট করে:

পবিত্র কুরআন — বাণী

أَكْثَرَ الَّذِي هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ

“তারা যে বিষয়গুলোর মধ্যে মতভেদ করে, তার অধিকাংশ।”

অর্থাৎ কুরআন বনি ইসরাইলের মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলোর অধিকাংশের বর্ণনা/ব্যাখ্যা/নিষ্পত্তিমূলক বক্তব্য উপস্থাপন করে।

২৬:১৯৭ — কারা কিতাবের জ্ঞান বহন করে?

আল্লাহ বলেন:

পবিত্র কুরআন — বাণী

أَوَلَمْ يَكُن لَّهُمْ آيَةً أَن يَعْلَمَهُ عُلَمَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ

“তাদের জন্য কি এটি একটি নিদর্শন নয় যে, বনি ইসরাইলের জ্ঞানীরা এটি জানে?”

— সূরা আশ-শুআরা, ২৬:১৯৭

পবিত্র কুরআন — বাণী

এখানে عُلَمَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিব্যক্তি।

অর্থাৎ কিতাবের বক্তব্য বুঝতে জ্ঞান, অধ্যয়ন এবং পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের জ্ঞানও প্রাসঙ্গিক।

এ কারণে কুরআনকে শুধু নিজের পছন্দের একটি অনুবাদ ধরে নিয়ে বিচার না করে, কুরআনের নিজস্ব শব্দভাণ্ডার ও পারস্পরিক আয়াত-সম্পর্কের মধ্যে বিচার করা প্রয়োজন।

৭:১৯৬ এবং “অলি” প্রসঙ্গ

পবিত্র কুরআন — বাণী

إِنَّ وَلِيِّيَ اللَّهُ الَّذِي نَزَّلَ الْكِتَابَ ۖ وَهُوَ يَتَوَلَّى الصَّالِحِينَ

“নিশ্চয়ই আমার ওলি আল্লাহ, যিনি কিতাব নাজিল করেছেন; আর তিনি সৎকর্মশীলদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।”

— সূরা আল-আ'রাফ, ৭:১৯৬

এখানে وَلِيِّي (waliyyī)-এর অর্থকে শুধু প্রচলিত কোনো ধর্মীয় পরিভাষায় আটকে না রেখে কুরআনের অন্যান্য ব্যবহার দেখতে হয়। একইভাবে الَّذِي نَزَّلَ الْكِتَابَ বাক্যাংশটি আল্লাহর সঙ্গে কিতাব নাজিলের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে।

অনুমান নয়, যতটুকু জানা যায় ততটুকুই বলা

কুরআন এ ব্যাপারে অত্যন্ত পরিষ্কার:

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ

“যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।”

— সূরা বনি ইসরাইল, ১৭:৩৬

আরও বলে:

পবিত্র কুরআন — বাণী

إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ ۖ وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا

“তারা তো কেবল অনুমানের অনুসরণ করে; আর নিশ্চয়ই অনুমান সত্যের কোনো বিকল্প নয়।”

— সূরা আন-নাজম, ৫৩:২৮

সুতরাং কুরআন গবেষণায় একটি মৌলিক নীতি হওয়া উচিত:

“যতটুকু জানা যায়, ততটুকুই বলা।

যেখানে প্রমাণ নেই, সেখানে অনুমানকে জ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন না করা।”

তাহলে কে গ্রহণ করবে?

শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক পাঠক একইভাবে কিতাব গ্রহণ করবে এমন নয়।

আল্লাহ বলেন:

পবিত্র কুরআন — বাণী

أُولَٰئِكَ حِزْبُ اللَّهِ ۚ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

“তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখো, আল্লাহর দলই সফল।”

— সূরা আল-মুজাদালাহ, ৫৮:২২

এখানে মূল প্রশ্ন হলো, আমি কতজনকে বোঝাতে পারলাম তা নয়। বরং আমি যে কথা বলছি, তা কিতাবের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আল্লাহ যাকে পথ দেখান, সে গ্রহণ করবে। কেউ গ্রহণ না করলেও সত্যের মানদণ্ড বদলে যায় না।

তাই কুরআন নিয়ে কথা বলার সময় গবেষকের অবস্থান:

✓

আমি কাউকে আমার কথা মানাতে আসিনি।

✓

আমি যতটুকু বুঝেছি, কিতাবের আয়াত, শব্দ, ব্যাকরণ ও পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ততটুকুই তুলে ধরছি।

✓

যেখানে নিশ্চিত জ্ঞান নেই, সেখানে অনুমানকে সত্য বলে দাবি করছি না।

✓

কে কতটুকু গ্রহণ করবে, সে সিদ্ধান্ত তার।

কারণ কুরআনকে বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এটি নয়— “আমি কী বিশ্বাস করি?”

বরং প্রশ্নটি হলো— “কিতাব নিজে কী বলছে?”

আর সেই উত্তর খুঁজতে হলে বাংলা অনুবাদের ওপর অন্ধ নির্ভরতা নয়, কুরআনের নিজের ভাষা, শব্দমূল, ব্যাকরণ, প্রসঙ্গ এবং সমগ্র কিতাবের পারস্পরিক সামঞ্জস্যকে সামনে রাখতে হবে।

কুরআনের সার্বজনীন কষ্টিপাথর (৪:৮২):

“তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা করে না? যদি এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে বহু বৈপরীত্য পেত।”

— সূরা আন-নিসা, ৪:৮২

এই আয়াতটিই তাই গবেষকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা: একটি আয়াতের অর্থ দাঁড় করানোর পর দেখতে হবে, পুরো কিতাবের সঙ্গে সেটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।