- লেখক: আলম এম.
- পাঠকাল: ১৪ মিনিট
কুরআনের আয়াতে প্রকৃতি, মহাবিশ্ব ও সৃষ্টির নিদর্শন
কুরআন নিজেকে এমন একটি কিতাব হিসেবে উপস্থাপন করে, যার প্রতিটি আয়াত মানুষকে চিন্তা, গভীর পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধির দিকে আহ্বান জানায়। আকাশ, পৃথিবী, রাত-দিন, পানি, সমুদ্র, জীবজগৎ, মানবদেহ এবং সৃষ্টির পরিবর্তনশীল অবস্থার প্রতি বারবার মানবজাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
এই আয়াতগুলোর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বা শুষ্ক প্রাকৃতিক তথ্যের খণ্ডচিত্র নয়; বরং সমগ্র প্রকৃতিকে মানুষের বোধোদয়ের জন্য “আয়াত” (آيَات)—অর্থাৎ জীবন্ত ঐশী নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করে।
🌌
কুরআনে আলোচিত প্রাকৃতিক ও মহাজাগতিক নিদর্শনসমূহের নির্ঘণ্ট
সারসংক্ষেপ সারণী
বিষয়
কুরআনিক শব্দ ও ধাতু
আয়াত সূত্র
কেন্দ্রীয় তাৎপর্য ও তাদাব্বুর
উদয়াচল ও অস্তাচলের বহুত্ব
الْمَشَارِقِ وَالْمَغَارِبِ (ش-ر-ق / غ-ر-ب)
৭০:৪০, ৭৩:৯
মহাজাগতিক উদয়-অস্তের বহুস্তরীয় ব্যবস্থা ও সার্বিক সার্বভৌমত্ব।
মহাবিশ্ব গুটিয়ে নেওয়ার উপমা
نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيِّ السِّجِلِّ (ط-و-ي)
২১:১০৪
সৃষ্টির সূচনা যেমন হয়েছিল, তেমনি বর্তমান বিন্যাসের সংকোচন ও রূপান্তর।
ভয়ানকতায় বয়সের রূপান্তর
يَجْعَلُ الْوِلْدَانَ شِيبًا (ش-ي-ب)
৭৩:১৭
চরম মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও আতঙ্কের অভিঘাতে বয়োচিহ্নের তাৎক্ষণিক পরিবর্তন।
আকাশের দ্বার ও দৃষ্টির বিভ্রান্তি
فَظَلُّوا فِيهِ يَعْرُجُونَ (ع-ر-ج / س-ك-ر)
১৫:১৪–১৫
মহাকাশে আরোহণের সময় চাক্ষুষ বাস্তবতার আচ্ছন্নতা ও জাদুমুগ্ধ অনুভূতি।
পাথর বা লোহায় রূপান্তর
كُونُوا حِجَارَةً أَوْ حَدِيدًا (ح-د-د)
১৭:৪৯–৫০
পদার্থের যে অবস্থাতেই শরীর বিলীন হোক, পুনরুজ্জীবনে স্রষ্টার অসীম ক্ষমতা।
মাকড়সার ঘরের দুর্বলতা
اتَّخَذَتْ بَيْتًا (ع-ن-ك-ب-ت)
২৯:৪১
মিথ্যা আশ্রয় ও অবলম্বনের চরম ভঙ্গুরতার জীবতাত্ত্বিক উপমা।
আঙুলের অগ্রভাগের সূক্ষ্মতা
نُّسَوِّيَ بَنَانَهُ (ب-ن-ن)
৭৫:৩–৪
পুনর্গঠনের সময় প্রতিটি সূক্ষ্ম শারীরিক অনন্যতা যথাযথভাবে ফিরিয়ে আনা।
লোহার মহাজাগতিক অবতরণ
وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ (ن-ز-ل / ح-د-د)
৫৭:২৫
মহাজাগতিক অবতরণ, প্রচণ্ড শক্তি এবং সভ্যতার সার্বিক কল্যাণ।
উচ্চতায় বক্ষ সংকুচিত হওয়া
يَصَّعَّدُ فِي السَّمَاءِ (ض-ي-ق / ص-ع-د)
৬:১২৫
আকাশে আরোহণকালীন বক্ষের কষ্টদায়ক সংকীর্ণতা ও অন্তরের ব্যাধির উপমা।
গভীর সমুদ্রের বহুমাত্রিক অন্ধকার
فِي بَحْرٍ لُّجِّيٍّ (ل-ج-ج)
২৪:৪০
অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ, মেঘ ও বহুস্তরীয় অন্ধকারের মাধ্যমে আলোহীনতার চিত্র।
পরিমিত বৃষ্টির পানি
مَاءً بِقَدَرٍ (ق-د-ر)
২৩:১৮
জীবনধারণের জন্য পানির সুনির্দিষ্ট ভারসাম্যে সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা।
রক্তিম গোলাপের রূপান্তর
فَكَانَتْ وَرْدَةً كَالدِّهَانِ (و-ر-د)
৫৫:৩৭
আকাশ বিদীর্ণ হয়ে গলিত তেল ও রক্তিম গোলাপের দৃশ্য ধারণ করার মহাজাগতিক রূপক।
১
উদয়াচল ও অস্তাচলের বহুত্ব: মহাজাগতিক পরিভ্রমণ
কুরআনে মহাবিশ্ব সৃষ্টির নিয়ামক ও দিগন্তসমূহের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ঘোষণা করেন:
فَلَا أُقْسِمُ بِرَبِّ الْمَشَارِقِ وَالْمَغَارِبِ إِنَّا لَقَادِرُونَ
(ফালা উকসিমু বিরাব্বিল-মাশারিকি ওয়াল-মাগারিবি ইন্না লাকাদিরূন।)
“অতএব আমি শপথ করছি উদয়স্থানসমূহ ও অস্তস্থানসমূহের প্রতিপালকের; নিশ্চয়ই আমরা পরিপূর্ণভাবে সক্ষম।”
الْمَشَارِقِ (আল-মাশারিক)
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় দুটি মৌলিক আরবি শব্দ:
অনুবাদ: ধাতু: ش ر ق
অর্থের মূল কেন্দ্র: পূর্বদিক, উদিত হওয়া, উদয়ের স্থান বা বহুবিধ উদয়বিন্দু।
الْمَغَارِبِ (আল-মাগারিব)
ধাতু: غ ر ب
অর্থের মূল কেন্দ্র: পশ্চিমে গমন, অস্ত যাওয়া, অস্তের স্থান বা বহুবিধ সূর্যাস্তবিন্দু।
কুরআন এখানে একবচন مَشْرِق বা مَغْرِب ব্যবহার না করে বহুবচন مَشَارِق ও مَغَارِب ব্যবহার করেছে। ফলে আয়াতটি কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের কথাই বলছে—এমনটি শব্দগতভাবে সীমাবদ্ধ নয়।
কুরআনের অন্য আয়াতে আবার দ্বিবচন এবং একবচনের রূপও এসেছে:
رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ فَاتَّخِذْهُ وَكِيلًا
(রাব্বুল-মাশরিকি ওয়াল-মাগরিবি লা ইলাহা ইল্লা হুয়া ফাত্তাখিযহু ওয়াকীলা।)
“তিনি উদয়ের ও অস্তের প্রতিপালক। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। অতএব তাঁকেই অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করো।” — সূরা আল-মুযযাম্মিল (৭৩:৯)
অর্থাৎ উদয় ও অস্তের বিচিত্র অবস্থানসমূহকে কুরআন সমগ্র সৃষ্টিজগতের এক বৃহৎ, সমন্বিত ও সুষম ব্যবস্থার নিদর্শন হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরেছে।
২
আকাশ গুটিয়ে নেওয়ার উপমা: মহাবিশ্বের সংকোচন ও সূচনা
কুরআন মহাবিশ্বের বর্তমান মহাজাগতিক সম্প্রসারণের পাশাপাশি তার ভবিষ্যৎ অন্তিম রূপান্তরের কথাও অত্যন্ত চমৎকার শৈল্পিক উপমায় বিবৃত করেছে:
يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيِّ السِّجِلِّ لِلْكُتُبِ ۚ كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيدُهُ ۚ وَعْدًا عَلَيْنَا ۚ إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ
(ইয়াওমা নাতউইস-সামা-আ কাতাইয়িস-সিজিল্লি লিল-কুতুবি কামা বাদানা আওয়ালা খালকিন নু‘ঈদুহু; ওয়াদান ‘আলাইনা; ইন্না কুন্না ফা‘ইলীন।)
“যেদিন আমরা আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেমন লিখিত দলিলের জন্য রেজিস্ট্রি বা নথি গুটিয়ে নেওয়া হয়। যেভাবে আমরা প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবেই তা পুনরায় ফিরিয়ে আনব। এটি আমাদের ওপর অর্পিত প্রতিশ্রুতি; নিশ্চয়ই আমরা তা সম্পাদনকারী।”
সূরা আল-আম্বিয়া (২১:১০৪)
এখানে نَطْوِي (নাতউই) শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে ط ـ و ـ ي (ত্বা-ওয়া-ইয়া) মূল থেকে। এর অর্থ হলো গুটিয়ে নেওয়া, ভাঁজ করা, প্রসারিত বস্তুকে সংকুচিত করে একবিন্দুতে আনা।
আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে: كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيدُهُ —অর্থাৎ প্রথম সৃষ্টির সূচনার সাথে ভবিষ্যৎ পুনরাবৃত্তির একটি সরাসরি যোগসূত্র নির্দেশ করা হয়েছে। সৃষ্টি স্থির বা চিরকাল অপরিবর্তনশীল কোনো কাঠামো নয়; স্রষ্টার ইচ্ছায় মহাবিশ্বের স্থান-কাল (spacetime) তার আদিম সূচনার মতোই নতুন এক বাস্তবতায় প্রত্যাবর্তিত হতে পারে।
৩
ভয়াবহতা মানুষের বয়সের চিহ্ন বদলে দিতে পারে
কেয়ামতের ভয়াবহ মানসিক অভিঘাত কীভাবে শারীরিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে, সূরা আল-মুযযাম্মিলে তা অসাধারণ রূপে ফুটে উঠেছে:
فَكَيْفَ تَتَّقُونَ إِن كَفَرْتُمْ يَوْمًا يَجْعَلُ الْوِلْدَانَ شِيبًا
(ফাকাইফা তাত্তাকূনা ইন কাফারতুম ইয়াওমান ইয়াজ‘আলুল-উলদানা শীবা।)
“অতএব তোমরা যদি অস্বীকার করো, তবে কীভাবে নিজেদের রক্ষা করবে সেই দিন থেকে, যে দিনটি শিশুদের শ্বেতকেশী করে দেবে?”
সূরা আল-মুযযাম্মিল (৭৩:১৭)
এখানে شِيبًا (শীবা) শব্দটি এসেছে ش ـ ي ـ ب (শা-ইয়া-বা) মূল থেকে, যার অর্থ বার্ধক্যজনিত শুভ্রকেশ। আয়াতটি মূলত চরম ভীতি ও সংকটের তীব্রতা প্রকাশ করতে গিয়ে এই চিত্র তুলে ধরেছে—যে শিশুর বয়স এখনো স্বাভাবিক বার্ধক্যে পৌঁছায়নি, সেই শিশুর চুলও যেন সেই দিনের আকস্মিক আতঙ্কে শুভ্র হয়ে যাবে।
৪
আকাশের দরজা এবং দৃষ্টির বিভ্রান্তি
কুরআনে মহাকাশ ও ঊর্ধ্বজগতে আরোহণের এক অভূতপূর্ব দৃশ্যকল্প পেশ করা হয়েছে:
وَلَوْ فَتَحْنَا عَلَيْهِم بَابًا مِّنَ السَّمَاءِ فَظَلُّوا فِيهِ يَعْرُجُونَ لَقَالُوا إِنَّمَا سُكِّرَتْ أَبْصَارُنَا بَلْ نَحْنُ قَوْمٌ مَّسْحُورُونَ
(ওয়ালাও ফাতাহনা ‘আলাইহিম বাবাম মিনাস-সামাই ফাযাল্লু ফীহি ইয়া‘রুজূন। লাকালূ ইন্নামা সুক্কিরাত আবসারুনা বাল নাহনু কওমুম মাসহূরূন।)
“যদি আমরা তাদের জন্য আকাশের একটি দ্বার উন্মুক্ত করে দিই এবং তারা তাতে ক্রমাগত আরোহণ করতে থাকে, তবুও তারা বলবে, ‘আমাদের দৃষ্টিই যেন স্তম্ভিত বা রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে; বরং আমরা তো জাদুগ্রস্ত এক সম্প্রদায়!’”
সূরা আল-হিজর (১৫:১৪–১৫)
এখানে يَعْرُجُونَ (ইয়া‘রুজূন) এসেছে ع ـ ر ـ ج ধাতু থেকে, যার মধ্যে বক্ররেখায় ঊর্ধ্বগমন বা আকাশে ওঠার স্পষ্ট অর্থ রয়েছে। মানুষের চাক্ষুষ বোধ ও পৃথিবীর চেনা পরিবেশ ছেড়ে মহাকাশের গাঢ় অন্ধকারে প্রবেশের সময় যে অপটিক্যাল ও মনস্তাত্ত্বিক হতবিহ্বলতা ঘটে, আয়াতে মানুষের সেই অবিশ্বাস ও বিভ্রান্তিকে নির্দেশ করা হয়েছে।
৫
পাথর বা লোহা হয়ে গেলেও পুনরুত্থানের অনিবার্যতা
মৃত্যুর পর মানবদেহের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার সংশয় নিরসনে কুরআন এমন পদার্থকে উদাহরণ হিসেবে টেনেছে যা মাটিতে সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না:
وَقَالُوا أَإِذَا كُنَّا عِظَامًا وَرُفَاتًا أَإِنَّا لَمَبْعُوثُونَ خَلْقًا جَدِيدًا قُلْ كُونُوا حِجَارَةً أَوْ حَدِيدًا
(ওয়া কালূ আ-ইযা কুন্না ‘ইযামাও ওয়া রুফাতান আ-ইন্না লামাব‘ূছূনা খালকান জাদীদা। কুল কূনূ হিজারাতান আও হাদীদা।)
“তারা বলে, ‘আমরা যখন অস্থি ও চূর্ণবিচূর্ণ ধূলিকণায় পরিণত হব, তখনও কি আমরা নতুন সৃষ্টি হিসেবে পুনরুত্থিত হব?’ বলো, ‘তোমরা পাথর হয়ে যাও অথবা লোহা!’”
সূরা আল-ইসরা (১৭:৪৯–৫০)
এখানে حِجَارَة (হিজারাহ) অর্থ পাথর এবং حَدِيد (হাদীদ) অর্থ লোহা। কুরআনের কেন্দ্রীয় বার্তা হলো—মানুষের নশ্বর দেহের উপাদান যতই পরিবর্তিত বা কঠিন ফসিল ও খনিজে পরিণত হোক না কেন, মহান স্রষ্টার পুনর্বার একত্রিত করার সক্ষমতার বাইরে কোনো পদার্থই থাকতে পারে না।
৬
মাকড়সার ঘর: ভঙ্গুর আশ্রয় ও জীববৈচিত্র্যের উপমা
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো শক্তির ওপর ভরসা করার অসারতা বোঝাতে কুরআনে একটি অনন্য প্রাণীবিজ্ঞানের উপমা দেওয়া হয়েছে:
مَثَلُ الَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِ اللَّهِ أَوْلِيَاءَ كَمَثَلِ الْعَنكَبُوتِ اتَّخَذَتْ بَيْتًا ۖ وَإِنَّ أَوْهَنَ الْبُيُوتِ لَبَيْتُ الْعَنكَبُوتِ ۖ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ
(মাছালুল্লাযীনা ইত্তাখাযূ মিন দুনিল্লাহি আওলিয়া-আ কামাছালিল-‘আনকাবূতি ইত্তাখাযাত বাইতান; ওয়া ইন্না আওহানাল-বুয়ূতি লাবাইতুল-‘আনকাবূত; লাও কানূ ইয়া‘লামূন।)
“যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার মতো, যে একটি ঘর তৈরি করে। আর নিশ্চয়ই ঘরসমূহের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ঘর হলো মাকড়সার ঘর; যদি তারা উপলব্ধি করত!”
সূরা আল-আনকাবূত (২৯:৪১)
এখানে একটি আকর্ষণীয় ব্যাকরণগত দিক রয়েছে: اتَّخَذَتْ بَيْتًا (ইত্তাখাযাত বাইতান)—এখানে اتَّخَذَتْ ক্রিয়াটি স্ত্রীবাচক রূপে এসেছে। জীববিজ্ঞানে জানা যায় স্ত্রী মাকড়সাই প্রধানত জাল বা ঘর বোনে। তবে ব্যাকরণগত রূপের পাশাপাশি আয়াতের প্রত্যক্ষ উপমা হলো আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে অভিভাবক বা রক্ষাকর্তা মানার চরম অসহায়ত্ব।
৭
মানুষের আঙুলের অগ্রভাগ: অনন্য শারীরস্থান ও পুনর্গঠন
মানুষের পুনরুত্থান সম্পর্কে অবিশ্বাস্য নিখুঁত ক্ষমতার সাক্ষ্য দেয় সূরা আল-কিয়ামাহ:
أَيَحْسَبُ الْإِنسَانُ أَلَّن نَّجْمَعَ عِظَامَهُ بَلَىٰ قَادِرِينَ عَلَىٰ أَن نُّسَوِّيَ بَنَانَهُ
(আইয়াহসাবুল-ইনসানু আল্লান নাজমা‘আ ‘ইযামাহু। বালা কাদিরীনা ‘আলা আন নুসাওয়িয়া বানানাহু।)
“মানুষ কি মনে করে যে আমরা তার অস্থিসমূহকে একত্রিত করব না? অবশ্যই করব! বরং আমরা তার আঙুলের অগ্রভাগসমূহও যথাযথভাবে বিন্যস্ত করতে সক্ষম।”
সূরা আল-কিয়ামাহ (৭৫:৩–৪)
এখানে ব্যবহৃত بَنَان (বানান) শব্দটি আঙুলের অগ্রভাগ (fingertips) বা আঙুলের সূক্ষ্ম সন্ধিস্থলের নির্দেশক। কুরআন এখানে শুধু সামগ্রিক কঙ্কালের কথা বলেনি; বরং মানুষের যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে অনন্য ফিংগারপ্রিন্ট ও রেখা রয়েছে, তাকেও নিখুঁতভাবে পুনর্বিন্যস্ত করার ঘোষণা দিয়েছে।
৮
লোহা: মহাজাগতিক শক্তি ও মানব সভ্যতার চাবিকাঠি
পবিত্র কুরআনের ৫৭তম সূরাটির নামই রাখা হয়েছে আল-হাদীদ (الْحَدِيد) অর্থাৎ লোহা। আয়াতে বলা হয়েছে:
وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ
(ওয়া আনযালনাল-হাদীদা ফীহি বা’সুন শাদীদুন ওয়া মানাফি‘উ লিন্নাস।)
“আর আমরা লোহা অবতীর্ণ করেছি; তাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ।”
সূরা আল-হাদীদ (৫৭:২৫)
এখানে মূল শব্দ দুটি গভীর অর্থবহ:
1.
أَنزَلْنَا (আনযালনা): ধাতু ن ـ ز ـ ل। এর অর্থ ওপর থেকে নিচে নামানো, অবতরণ করানো। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে যে লোহা পৃথিবীর মাটিতে উৎপাদিত হয়নি, বরং কোটি কোটি বছর পূর্বে মহাবিশ্বের বিশালাকার সুপারনোভা নক্ষত্রের অন্তর্বিস্ফোরণের মাধ্যমে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিল।
2.
بَأْسٌ شَدِيدٌ (বা’সুন শাদীদ): সামরিক শক্তি, কাঠামোগত কঠোরতা ও সহনশীলতা; পাশাপাশি মানুষের নির্মাণ, পরিবহন ও প্রযুক্তির মূল উৎস।
অন্যত্র হযরত দাউদ (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে: وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيدَ —“আর আমরা তাঁর জন্য লোহাকে নমনীয় করে দিয়েছিলাম” (সূরা সাবা ৩৪:১০)।
৯
সংকুচিত অন্তর ও আকাশে আরোহণের শারীরবৃত্তীয় উপমা
হিদায়াতবঞ্চিত অন্তরের যন্ত্রণা ও সংকীর্ণতাকে কুরআন মহাকাশে আরোহণের তীব্র শারীরিক অনুভূতির সাথে তুলনা করেছে:
فَمَن يُرِدِ اللَّهُ أَن يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ ۖ وَمَن يُرِدْ أَن يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِي السَّمَاءِ
(ফামাই ইউরিদিল্লাহু আন ইয়াহদিয়াহু ইয়াশরাহ সদরাহু লিল-ইসলাম; ওয়া মাই ইউরিদ আন ইউদিল্লাহু ইয়াজ‘আল সদরাহু দাইয়িকান হারাজান কা-আন্নামা ইয়াস্সা‘আদু ফিস-সামা।)
“আল্লাহ যাকে পথনির্দেশ দিতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে এমন সংকীর্ণ ও সঙ্কুচিত করে দেন যেন সে আকাশে আরোহণ করছে!”
সূরা আল-আন‘আম (৬:১২৫)
এখানে يَصَّعَّدُ فِي السَّمَاءِ (ইয়াস্সা‘আদু ফিস-সামা) রূপকের মধ্যে উচ্চতায় ওঠার সাথে সাথে বায়ুর ঘনত্ব ও অক্সিজেনের চাপ হ্রাসের ফলে মানবদেহে যে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও বক্ষ সংকোচনের অনুভূতি তৈরি হয়, তার চমৎকার প্রাকৃতিক সাদৃশ্য বিধৃত হয়েছে।
১০
গভীর সমুদ্রের স্তরভিত্তিক অন্ধকার ও অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ
কুরআনের অন্যতম বিস্ময়কর ও শক্তিশালী উপমা এসেছে সূরা আন-নূরে:
أَوْ كَظُلُمَاتٍ فِي بَحْرٍ لُّجِّيٍّ يَغْشَاهُ مَوْجٌ مِّن فَوْقِهِ مَوْجٌ مِّن فَوْقِهِ سَحَابٌ ۚ ظُلُمَاتٌ بَعْضُهَا فَوْقَ بَعْضٍ ۚ إِذَا أَخْرَجَ يَدَهُ لَمْ يَكَدْ يَرَاهَا ۗ وَمَن لَّمْ يَجْعَلِ اللَّهُ لَهُ نُورًا فَمَا لَهُ مِن نُّورٍ
(আও কা-যুলুমাতিন ফী বাহরিল-লুজ্জিয়্যিন ইয়াগশাহু মাওজুম মিন ফাওকিহি মাওজুম মিন ফাওকিহি সাহাব; যুলুমাতুন বা‘দুহা ফাওকা বা‘দ; ইযা আখরাজা ইয়াদাহু লাম ইয়াকাদ ইয়ারাহা; ওয়া মাল্লাম ইয়াজ‘আলিল্লাহু লাহু নূরান ফামা লাহু মিন নূর।)
“অথবা তা গভীর অথৈ সমুদ্রের অন্ধকারের মতো; যাকে আচ্ছন্ন করে এক তরঙ্গ, তার ওপর আরেক তরঙ্গ, তার ওপর ঘন মেঘমালা। এক অন্ধকারের ওপর আরেক অন্ধকারের বহু স্তর! সে যখন নিজের হাত প্রসারিত করে, তখনও তা দেখতে পায় না। আর আল্লাহ যার জন্য কোনো আলো নির্ধারণ করেননি, তার কোনো আলো নেই।”
সূরা আন-নূর (২৪:৪০)
بَحْرٍ لُّجِّيٍّ (বাহরিন লুজ্জিয়্য) হলো গভীর অতল সমুদ্র। সমুদ্রবিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে গভীর সাগরে রয়েছে অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ (Internal Waves), যার ওপরে থাকে পৃষ্ঠতরঙ্গ (Surface Waves) এবং তার ওপরে ঘন মেঘমালা। এই একাধিক স্তরের কারণে ২০০ মিটার নিচে আলো বিলীন হয়ে যায় এবং ১০০০ মিটার গভীরে নেমে আসে সম্পূর্ণ পিচ-কালো অন্ধকার।
১১
পানি ও পৃথিবীর জীবনের ভারসাম্য
পানির পরিমিত অবতরণ ও স্থিতিশীলতা সম্পর্কে সূরা আল-মু’মিনূনে বলা হয়েছে:
وَأَنزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً بِقَدَرٍ فَأَسْكَنَّاهُ فِي الْأَرْضِ ۖ وَإِنَّا عَلَىٰ ذَهَابٍ بِهِ لَقَادِرُونَ
(ওয়া আনযালনা মিনাস-সামাই মা-আন বিকাদারিন ফা-আসকান্নাহু ফিল-আরদি ওয়া ইন্না ‘আলা যাহাবিম বিহি লাকাদিরূন।)
“আর আমরা আকাশ থেকে পরিমিতভাবে পানি অবতীর্ণ করেছি এবং তা পৃথিবীতে স্থিতিশীল রেখেছি; আর আমরা তা সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করতেও সক্ষম।”
সূরা আল-মু’মিনূন (২৩:১৮)
এখানে بِقَدَرٍ (বিকাদারিন) শব্দটির তাৎপর্য অসাধারণ—যার অর্থ পরিমিতভাবে, নিখুঁত হিসেবে বা সুনির্দিষ্ট ভারসাম্যে। পৃথিবীতে পানি যদি অতিরিক্ত হতো তবে পৃথিবী চিরতরে ডুবে যেত, আর কম হলে মরুভূমিতে পরিণত হতো।
১২
আকাশের রক্তিম গোলাপের মতো দৃশ্য
মহাজাগতিক প্রলয়ের দিনে আকাশের রূপান্তরের একটি দৃশ্য এসেছে সূরা আর-রহমানে:
فَإِذَا انشَقَّتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ وَرْدَةً كَالدِّهَانِ
(ফাইযানশাক্কাতিস-সামা-উ ফাকানাত ওয়ারদাতান কালদ্দিহান।)
“যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং তা রক্তিম গোলাপের মতো হয়ে যাবে, যেন গলিত তরল বা লাল চামড়া।”
সূরা আর-রহমান (৫৫:৩৭)
وَرْدَة (ওয়ারদাহ) অর্থ লাল গোলাপ এবং الدِّهَان (আদ-দিহান) অর্থ গলিত তেল বা উজ্জ্বল চামড়া। দূর মহাবিশ্বে তারকার বিস্ফোরণের সময় সৃষ্ট রঙিন নেবুলার মতো দৃশ্যকল্প দিয়ে কুরআন শেষ দিনের মহাজাগতিক রূপান্তরের চিত্র তুলে ধরেছে।
১৩
সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তার ঐশী আহ্বান: উলিল আলবাব
এই সমস্ত মহাজাগতিক ও প্রাকৃতিক বর্ণনার শেষে কুরআনের মৌলিক দিকনির্দেশনাটি এসেছে সূরা আলে ইমরানে:
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ
(ইন্না ফী খালকিস-সামাওয়াতি ওয়াল-আরদি ওয়াখতিলাফিল-লাইলি ওয়ান-নাহারি লা-আয়াতিল লি-উলিল-আলবাব।)
“নিশ্চয়ই আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে বোধসম্পন্ন প্রজ্ঞাবানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”
সূরা আলে ইমরান (৩:১৯০)
এখানে أُولِي الْأَلْبَاب (উলিল আলবাব) বলতে বোঝানো হয়েছে সেই মানুষদের, যারা চিন্তার গভীর অন্তঃসারে (লুব্ব) পৌঁছাতে সক্ষম। প্রকৃতি কেবল মুগ্ধ হয়ে দেখার বিষয় নয়; এটি পরম স্রষ্টার অস্তিত্ব ও মহিমাকে উপলব্ধি করার মাধ্যম।
১৪
কুরআন ও প্রকৃতি: বিচ্ছিন্ন সংখ্যার চেয়ে বড় সত্য
কুরআনের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন আলোচনা করতে গিয়ে অনেকেই অতি-আগ্রহী হয়ে সংখ্যাগত চাতুর্য বা কৃত্রিম মিল খোঁজার চেষ্টা করেন। রাসায়নিক উপাদানের পরমাণু সংখ্যা, ক্রোমোজোম বা কৃত্রিম অক্ষর গণনার মিলগুলো অনেক সময় বৈজ্ঞানিক ও ভাষাতাত্ত্বিক উভয় দিক থেকেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
কুরআনের নিজস্ব আহ্বান কিন্তু এসব বিচ্ছিন্ন সংখ্যার চেয়ে বহুগুণে উদার, মহিমান্বিত ও যুক্তিনির্ভর। কুরআন বারবার মানুষকে আকাশ, পৃথিবী, মেঘমালা, জীবজগৎ ও নিজের সত্তার দিকে তাকিয়ে তাদাব্বুর বা গভীর অনুশীলনের নির্দেশ দেয়:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
(আফালা ইয়াতাদাব্বারূনাল-কুরআন; ওয়ালাও কানা মিন ‘ইন্দি গাইরিল্লাহি লাওয়াজাদূ ফীহিখতিলাফান কাছীরা।)
“তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে তাদাব্বুর করে না? এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে অবশ্যই তারা এতে বহু অসঙ্গতি ও বৈপরীত্য পেত।”
সূরা আন-নিসা (৪:৮২)
يَتَدَبَّرُونَ (ইয়াতাদাব্বারূন) এসেছে د ـ ب ـ ر মূল থেকে, যার অর্থ কোনো বিষয়ের পেছনের গভীর কারণ, ফলাফল ও সামগ্রিক সামঞ্জস্য বিবেচনা করা।
সুতরাং কুরআনের প্রকৃতি-বিষয়ক আয়াত পড়ার ক্ষেত্রে কোনো বিচ্ছিন্ন তথ্য জোর করে মেলানোর প্রয়োজন নেই। আয়াতের শব্দ, ব্যাকরণ, প্রসঙ্গ এবং বিশ্বজগতের নিয়মের সামগ্রিক সমন্বয় অনুধাবন করাই কুরআনের মূল আহ্বান।

