ইলম: কুরআনে জ্ঞানের ভাষাতাত্ত্বিক ও ধারণাগত বিশ্লেষণ

আলম এম.আলম এম.১ অক্টোবর, ২০২৬

“কুরআনে ‘ইলম’ শব্দটি বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের প্রচলিত সামাজিক অর্থ থেকে কিছুটা সরে আসতে হবে। আজকের ব্যবহারে ‘আলেম’ বলতে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। কিন্তু কুরআনের ভাষা কোনো আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক উপাধির ওপর নির্ভর করে না। তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত: কুরআন নিজে ‘ইলম’ এবং এর সংশ্লিষ্ট শব্দগুলো কীভাবে ব্যবহার করেছে?”

🔍

শব্দের ভেতর থেকে অর্থের দিকে

এই অনুসন্ধানের জন্য মূলধাতু, সরফ, নাহু এবং কুরআনিক ব্যবহারকে একসঙ্গে দেখতে হবে। এখানে মূলধাতু হলো:

মূলধাতু (Trilateral Root)

৩ অক্ষরের বীজ

ع ل م

আন্তর্জাতিক উচ্চারণ: ‘ayn-lām-mīm

বাংলা উচ্চারণ: আইন-লাম-মীম

এই মূলধাতু থেকে কুরআনে জ্ঞান ও জানার সঙ্গে সম্পর্কিত বহু রূপ এসেছে। কুরআনিক আরবি করপাসে عَلِيم রূপটি ১৬৩ বার, عَالِم ১৮ বার এবং مَعْلُوم ১১ বার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

📊

কুরআনে ‘ع ل م’ মূলধাতুর প্রাথমিক রূপ ও অর্থসূচি

ভাষাতাত্ত্বিক সারণি

আরবি রূপ

উচ্চারণ

মৌলিক অর্থ

কুরআনিক ব্যাকরণিক পরিচয়

عَلِمَ

আলিমা

সে জানল / অবগত হলো

Form I অতীত ক্রিয়া (Past Verb)

পবিত্র কুরআন — বাণী

يَعْلَمُ

ইয়া‘লামু

সে জানে / অবগত থাকে

Form I বর্তমান ক্রিয়া (Imperfect Verb)

عِلْم

ইলম

জ্ঞান / নিশ্চিত অবগতি

মাসদার (Verbal Noun)

عَلَّمَ

আল্লামা

শিক্ষা দিল / জ্ঞান প্রদান করল

Form II কার্যকারণ ক্রিয়া (Causative)

পবিত্র কুরআন — বাণী

يُعَلِّمُ

ইউ‘আল্লিমু

শিক্ষা দেয়

Form II বর্তমান ক্রিয়া

পবিত্র কুরআন — বাণী

تَعَلَّمَ

তা‘আল্লামা

শেখে / জ্ঞান গ্রহণ করে

Form V রূপ (Reflexive)

عَالِم

আলিম

জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি (যে জানে)

Form I কর্তৃবাচ্য বিশেষ্য (Active Participle)

পবিত্র কুরআন — বাণী

عُلَمَاء

উলামা

জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ

عَالِم-এর ভগ্ন বহুবচন (Broken Plural)

عَلِيم

আলীম

ব্যাপক / পরিপূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন

فَعِيل গুণবাচক রূপ (Intensive Adjective)

عَلَّام

আল্লাম

অদৃশ্যের জ্ঞানে পরিপূর্ণ / সর্বজ্ঞাতা

فَعَّال আধিক্যসূচক রূপ (Superlative)

পবিত্র কুরআন — বাণী

مَعْلُوم

মা‘লূম

জানা / জ্ঞাত / নির্ধারিত বিষয়

Form I কর্মবাচ্য বিশেষ্য (Passive Participle)

পবিত্র কুরআন — বাণী

مَعْلُومَات

মা‘লূমাত

নির্ধারিত / জ্ঞাত বিষয়সমূহ

স্ত্রীবাচক বহুবচন (Plural Noun)

এখন কুরআনের আলোতেই প্রতিটি রূপের প্রেক্ষাপট ও অর্থস্তর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা যাক:

১

মূলধাতু ع ل م: জানা

আরবি عَلِمَ (আলিমা) একটি ত্রিবর্ণমূল ধাতু। এর মৌলিক ক্রিয়াগত অর্থ: عَلِمَ = জানা / অবগত হওয়া। বর্তমান বা অসমাপিকা ক্রিয়ার রূপ: يَعْلَمُ (ইয়া‘লামু) = সে জানে।

📖 কুরআনিক ক্রিয়ার দৃষ্টান্ত

জানা ও অজ্ঞতার বৈপরীত্য

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ ۝

উচ্চারণ: Wallāhu ya‘lamu wa antum lā ta‘lamūn.

অর্থ: “আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।”

এখানে يَعْلَمُ (ইয়া‘লামু) একটি ক্রিয়া। এটি কোনো ব্যক্তির উপাধি নয়, বরং ‘জানা’ কাজটিকে প্রকাশ করছে। কুরআনিক করপাসে علم মূলধাতুর Form I ক্রিয়ার শত শত ব্যবহার পাওয়া যায়। অতএব ‘ইলম’কে বুঝতে গেলে প্রথম স্তরে ফিরে যেতে হয়: عَلِمَ → জানা এবং عِلْم → জানা বা জ্ঞানের অবস্থা/বিষয়।

২

عِلْم (ইলম): জ্ঞান

عِلْم (ইলম) হলো একই মূলধাতুর একটি মাসদার বা verbal noun। সহজভাবে: عَلِمَ (আলিমা) → জানা; عِلْم (ইলম) → জানা/জ্ঞান। কুরআনে এই শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে এসেছে।

📖 সূরা আল-বাকারা (২:৩২)

জ্ঞানের উৎস ও দান

পবিত্র কুরআন — বাণী

قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ ۝

উচ্চারণ: Qālū subḥānaka lā ‘ilma lanā illā mā ‘allamtanā.

অর্থ: “তারা বলল, তুমি পবিত্র। তুমি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছ তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই।”

এখানে لَا عِلْمَ لَنَا (lā ‘ilma lanā) অর্থাৎ: “আমাদের কোনো জ্ঞান নেই।” এর পরেই এসেছে: إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا (illā mā ‘allamtanā) — “তুমি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছ তা ছাড়া।” এখানে عِلْم (ইলম) এবং عَلَّمَ (আল্লামা) একই মূলধাতুর দুটি ভিন্ন সরফি রূপ। অর্থাৎ জ্ঞান ↔ শিক্ষা দেওয়া—দুটি ধারণা একই শব্দমূলের মধ্যে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

৩

عَلَّمَ (আল্লামা): জানা নয়, শিক্ষা দেওয়া

এখানে সরফের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। عَلِمَ (আলিমা) = জানা। এর Form II হলো: عَلَّمَ (আল্লামা) = শিক্ষা দেওয়া। Form II-এর সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো মূল ক্রিয়ার অর্থকে causative বা intensive দিকে নিয়ে যাওয়া। তাই:

عَلِمَ (Form I): জানা / অবগত হওয়া (Inherent knowing)

عَلَّمَ (Form II): কাউকে জানানো / জ্ঞান দেওয়া / শিক্ষা দেওয়া (Causative teaching)

📖 সূরা আল-বাকারা (২:৩১)

মানবিক চেতনার প্রারম্ভিক জ্ঞান

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ۝

উচ্চারণ: Wa ‘allama Ādama al-asmā’a kullahā.

অর্থ: “আর তিনি আদমকে সব নাম শিক্ষা দিলেন।”

এখানে عَلَّمَ (আল্লামা)-এর সঙ্গে একটি object আছে: آدَمَ (আদম)—অর্থাৎ কাউকে শিক্ষা দেওয়া। আর কী শিক্ষা দেওয়া হলো? الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا (al-asmā’a kullahā) — “সব নাম।” এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কুরআনিক ইলমের আলোচনায় ‘শিক্ষা’ শুধু কোনো ধর্মীয় বিধান শেখানো নয়; এই আয়াতে মানুষের জ্ঞানগত সক্ষমতার সঙ্গে الأسماء (আসমা, নামসমূহ/বাস্তবতার পরিচয় ও ধারণা) যুক্ত হয়েছে।

৪

يَعْلَمُ (ইয়া‘লামু): জানে

يَعْلَمُ (ইয়া‘লামু) হলো Form I-এর imperfect verb। মূল: عَلِمَ (আলিমা); বর্তমান/চলমান ক্রিয়াগত রূপ: يَعْلَمُ (ইয়া‘লামু); অর্থ: সে জানে। কুরআনে এর ব্যবহার অত্যন্ত বিস্তৃত।

📖 কুরআনিক ক্রিয়ার বিস্তার

মহাবিশ্বব্যাপী অবগতি

পবিত্র কুরআন — বাণী

إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۝

উচ্চারণ: Innallāha ya‘lamu mā fis-samāwāti wa mā fil-arḍ.

অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ জানেন যা আকাশমণ্ডলীতে এবং যা পৃথিবীতে রয়েছে।”

এই ব্যবহারগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে علم মূলধাতুর কেন্দ্রীয় ধারণা হলো সক্রিয়ভাবে জানা বা সর্বদা অবগত থাকা।

৫

عَلِيم (আলীম): জ্ঞানের ব্যাপকতা

عَلِيم (আলীম) একটি adjective বা intensive descriptive form। এর সিফাত বা pattern হলো: فَعِيل (ফা‘ঈল)। সাধারণ অনুবাদে প্রায়ই একে “সর্বজ্ঞ” বলা হয়। কুরআনে এটি বিশেষভাবে আল্লাহর গুণবাচক নাম/বর্ণনা হিসেবে বিপুলভাবে এসেছে।

📖 সূরা আল-বাকারা (২:২৯)

পরিপূর্ণ জ্ঞান

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ۝

উচ্চারণ: Wa huwa bikulli shay’in ‘alīm.

অর্থ: “আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন।”

কুরআনিক করপাসে عَلِيم শব্দটি ১৬৩ বার পাওয়া যায়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা আবশ্যক: عَالِم (আলিম) এবং عَلِيم (আলীম) একই জিনিস নয়। দুটিই একই মূলধাতু থেকে এসেছে, কিন্তু তাদের সরফি pattern ও অর্থের ব্যাপকতা ভিন্ন।

৬

عَالِم (আলিম): জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি

عَالِم (আলিম) হলো Form I active participle (اسم ফاعل)-এর রূপ। মূল ক্রিয়া: عَلِمَ = জানা; Active participle: عَالِم = যে জানে / জ্ঞানসম্পন্ন। এর বহুবচন হলো: عُلَمَاء (উলামা)। অর্থাৎ: عَالِم → عُلَمَاء।

⚠️ এই জায়গাটিই আমাদের আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়:

আধুনিক বাংলা ব্যবহারে ‘আলেম’ প্রায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় উপাধিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কুরআনিক শব্দটি প্রথমে একটি বিশুদ্ধ ভাষাতাত্ত্বিক রূপ—যার অর্থ কেবল ‘যে জানে বা জ্ঞান ধারণ করে’, কোনো আধুনিক মানবীয় সার্টিফিকেটের নাম নয়।

৭

عُلَمَاء (উলামা): কুরআনে মাত্র দুই বিশেষ প্রসঙ্গ

কুরআনে عُلَمَاء (উলামা) শব্দটি বিশেষভাবে মাত্র দুই জায়গায় এসেছে:

১ম প্রসঙ্গ: সূরা আশ-শু‘আরা (২৬:১৯৭)

ঐতিহাসিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা

পবিত্র কুরআন — বাণী

أَوَلَمْ يَكُن لَّهُمْ آيَةً أَن يَعْلَمَهُ عُلَمَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ ۝

উচ্চারণ: Awalam yakun lahum āyatan an ya‘lamahu ‘ulamā’u Banī Isrā’īl.

অর্থ: “তাদের জন্য কি এটি একটি নিদর্শন নয় যে বনী ইসরাঈলের জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা তা জানে?”

এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো: عُلَمَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ অর্থাৎ “বনী ইসরাঈলের উলামা/জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা।” এটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক গোষ্ঠীর পূর্ববর্তী কিতাব সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্ন মানুষদের নির্দেশ করছে।

২য় প্রসঙ্গ: সূরা ফাতির (৩৫:২৮)

সৃষ্টির বাস্তবতা ও গভীর সচেতনতা

পবিত্র কুরআন — বাণী

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ۗ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ ۝

উচ্চারণ: Innamā yakhshā Allāha min ‘ibādihil-‘ulamā’.

অর্থ: “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানসম্পন্নরাই কেবল আল্লাহ সম্পর্কে গভীর সতর্কতা ও সম্ভ্রম ধারণ করে।”

এখানে الْعُلَمَاءُ (আল-উলামা)-এর আগে যে প্রসঙ্গ এসেছে সেটিই সবচেয়ে বিস্ময়কর ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

৮

৩৫:২৭–২৮: উলামাদের আগে কী এসেছে?

সূরা ফাতিরের ৩৫:২৭ আয়াতে উলামাদের বর্ণনার ঠিক পূর্বে আল্লাহ কী তুলে ধরেছেন?

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجْنَا بِهِ ثَمَرَاتٍ مُّخْتَلِفًا أَلْوَانُهَا ۚ وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌ بِيضٌ وَحُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيبُ سُودٌ ۝

🌿 সূরা ফাতির (৩৫:২৭)

অনুবাদ: অনুবাদ: “তুমি কি দেখোনি, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর আমরা তা দ্বারা বিভিন্ন বর্ণের ফল উৎপন্ন করি? আর পাহাড়গুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের সাদা ও লাল রেখা এবং নিকষ কালো বর্ণেরও।”

🐾 সূরা ফাতির (৩৫:২৮ এর প্রথমাংশ)

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَمِنَ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالْأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَٰلِكَ ۗ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ۝

অনুবাদ: “আর মানুষের, জীবজন্তুর এবং গবাদিপশুর মধ্যেও রয়েছে তেমনি বিভিন্ন বর্ণ। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানসম্পন্নরাই তো কেবল তাঁকে সমীহ করে।”

কুরআনিক কার্যকারণ পরম্পরা

প্রকৃতির বৈচিত্র্য

→

পর্যবেক্ষণযোগ্য বাস্তবতা

→

জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ (উলামা)

→

আল্লাহ সম্পর্কে গভীর সচেতনতা

এখানে একটি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়: উলামা শব্দটিকে শুধুমাত্র একটি আধুনিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিধারীর সঙ্গে সমার্থক করার আগে এই প্রসঙ্গটি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এটি অবশ্য এমন দাবি করার প্রমাণ নয় যে প্রত্যেক আধুনিক বিজ্ঞানী স্বয়ংক্রিয়ভাবে কুরআনের ‘আলিম’। কুরআন এমন কোনো সরল অন্ধ সমীকরণও দেয়নি। বরং আয়াতটি যে মৌলিক সত্যটি উন্মোচিত করে তা হলো: জ্ঞান এবং বাস্তবতার নিদর্শন উপলব্ধির জীবন্ত সম্পর্ক।

৯

২৯:৪৩: ‘আলিমূন’ এবং উপলব্ধি

আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রূপ হলো: الْعَالِمُونَ (আল-‘আলিমূন)। এটি عَالِم-এর masculine sound plural (পুংলিঙ্গ সুস্থ বহুবচন)।

📖 সূরা আল-‘আনকাবূত (২৯:৪৩)

দৃষ্টান্ত ও জ্ঞানীদের বোধ

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ ۖ وَمَا يَعْقِلُهَا إِلَّا الْعَالِمُونَ ۝

উচ্চারণ: Wa tilkal-amthālu naḍribuhā linnāsi wa mā ya‘qiluhā illal-‘ālimūn.

অর্থ: “এসব দৃষ্টান্ত আমরা মানুষের জন্য উপস্থাপন করি; আর জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য কেউ এগুলো উপলব্ধি করে না।”

এখানে الْعَالِمُونَ এসেছে يَعْقِلُهَا (আকল দিয়ে উপলব্ধি করে)-এর সঙ্গে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু মুখস্থ তথ্য জানা নয়, বরং দৃষ্টান্তের গভীর সারবত্তাকে উপলব্ধি করতে পারার প্রজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত।

১০

পবিত্র কুরআন — বাণী

عَالِم এবং الْعَالَمِينَ এক নয়

এখানে একটি ভাষাতাত্ত্বিক সতর্কতা জরুরি। অনেক পাঠক ধ্বনিগত মিল দেখে বিভ্রান্ত হতে পারেন:

عَالِم

আলিম (‘Ālim)

জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি / যে জানে

عَالَم

আলাম (‘Ālam)

সৃষ্ট জগত / বিশ্বজগৎ

পবিত্র কুরআন — বাণী

الْعَالَمِينَ

আল-আলামীন (Al-‘Ālamīn)

সমস্ত জগতসমূহ / বিশ্বজাহান

পবিত্র কুরআন — বাণী

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ۝

অর্থ: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল জগতের প্রতিপালক।”

এখানে الْعَالَمِينَ-কে عَالِم অর্থাৎ ‘জ্ঞানী ব্যক্তিদের’ বহুবচন হিসেবে অনুবাদ করা সম্পূর্ণ ভুল। কুরআনিক করপাসে উভয়কে একই consonantal root ع ل م-এর অধীনে তালিকাভুক্ত করা হলেও ব্যাকরণগত রূপ ও অর্থক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখান থেকে একটি প্রধান গবেষণামূলক মূলনীতি স্পষ্ট হয়: একই মূলধাতুতে থাকা মানেই প্রতিটি শব্দের অর্থ এক নয়। অর্থ নির্ধারণে morphology (রূপমূল) এবং context (প্রসঙ্গ) দুটিই অপরিহার্য।

১১

عَالِم: জ্ঞানী, আর عَلِيم: ব্যাপক জ্ঞানসম্পন্ন

দুটি শব্দ পাশাপাশি রাখলে পার্থক্যটি স্পষ্ট ফুটে ওঠে:

عَالِم (আলিম)

Active Participle

যে ব্যক্তি একটি বিশেষ সময়ে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে জানে বা জ্ঞানসম্পন্ন হয়েছে।

عَلِيم (আলীম)

Pattern فَعِيل

ব্যাপক, নিরবচ্ছিন্ন, গভীর ও পরিপূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন—যা কুরআনে প্রধানত আল্লাহর অনন্ত গুণের প্রকাশ।

পবিত্র কুরআন — বাণী

إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ ۝

উচ্চারণ: Innallāha ‘alīmun bidhātis-ṣudūr.

অর্থ: “নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের মধ্যকার সুগভীর গোপন বিষয়গুলো সম্পর্কেও পরিপূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন।”

১২

عَلَّام: অদৃশ্যের জ্ঞানে পরিপূর্ণ

আরেকটি intensive form হলো: عَلَّام (আল্লাম)। কুরআনে এটি বিশেষভাবে غَيْب (গায়ব, অদৃশ্য)-এর সঙ্গে এসেছে। عَالِمُ الْغَيْبِ এবং عَلَّامُ الْغُيُوبِ উভয় রূপই অত্যন্ত গভীর।

📖 কুরআনিক আধিক্যসূচক রূপ

৪ বার পুনরাবৃত্ত (৫:১০৯, ৫:১১৬, ৯:৭৮, ৩৪:৪৮)

পবিত্র কুরআন — বাণী

إِنَّكَ أَنتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ ۝

উচ্চারণ: Innaka anta ‘allāmul-ghuyūb.

অর্থ: “নিশ্চয় তুমি সকল অদৃশ্য বিষয়ের পরিপূর্ণ জ্ঞাতা।”

এখানে আবার দেখা যায়: علم → জানা → জ্ঞান → জ্ঞানসম্পন্ন → ব্যাপক জ্ঞানসম্পন্ন → অদৃশ্যের জ্ঞাতা—একটি ধারাবাহিক নিখুঁত শব্দপরিবার গড়ে উঠছে।

১৩

مَعْلُوم: যা জানা বা নির্ধারিত

একই মূলধাতুর passive participle হলো: مَعْلُوم (মা‘লূম)। অর্থ: যা জানা হয়েছে / জ্ঞাত / নির্ধারিত। কুরআনিক করপাসে مَعْلُوم-এর ১১টি ব্যবহার চিহ্নিত হয়েছে।

পবিত্র কুরআন — বাণী

إِلَىٰ يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ ۝

উচ্চারণ: Ilā yawmi al-waqtil-ma‘lūm.

অর্থ: “নির্ধারিত সময়ের দিন পর্যন্ত।”

১৪

পবিত্র কুরআন — বাণী

تَعَلَّمَ: শেখা

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হলো Form V: تَعَلَّمَ (তা‘আল্লামা)। এর অর্থ: শেখা / শিক্ষা গ্রহণ করা।

📖 সূরা আল-বাকারা (২:১০২)

শিক্ষার উপযোগিতা ও ক্ষতিকর প্রভাব

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ ۝

উচ্চারণ: Wa yata‘allamūna mā yaḍurruhum wa lā yanfa‘uhum.

অর্থ: “তারা এমন কিছু শেখে যা তাদের ক্ষতি সাধন করে এবং তাদের কোনো উপকারে আসে না।”

💡 সারসংক্ষেপ ও বার্তা

শিক্ষণীয় নীতি:

কুরআন শুধু যান্ত্রিকভাবে ‘শেখা’কে সর্বাবস্থায় ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করেনি। মানুষ কী শিখছে এবং তার বাস্তব ফল কী, সেটিই আসল বিষয়। অর্থাৎ: ইলম থাকা যথেষ্ট নয়; ইলমের বিষয়বস্তু এবং তার নৈতিক ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৫

শিক্ষা মানেই শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়

কুরআনে عَلَّمَ-এর ব্যবহারগুলো লক্ষ্য করলে এর পরিধি কত বিশাল তা উপলব্ধি করা যায়। কুরআনিক করপাসে عَلَّمَ-এর ৪১টি Form II verb occurrence চিহ্নিত হয়েছে:

আদম (আ.)

নাম ও বাস্তবতার চেতনা

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا

“আর তিনি আদমকে সব নাম শিক্ষা দিলেন।” (২:৩১)

দাউদ (আ.)

প্রকৌশল ও কারিগরি বিদ্যা

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَعَلَّمْنَاهُ صَنْعَةَ لَبُوسٍ لَّكُمْ

“আমরা তাকে তোমাদের জন্য বর্ম তৈরির কারিগরি শিক্ষা দিয়েছিলাম।” (২১:৮০)

সুলাইমান (আ.)

প্রাণীজগতের যোগাযোগ

পবিত্র কুরআন — বাণী

عُلِّمْنَا مَنطِقَ الطَّيْرِ

“আমাদের পাখির ভাষা/যোগাযোগ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।” (২৭:১৬)

অতএব ‘শিক্ষা’ শব্দটিকে কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শেখানোর সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করার কোনো ভাষাতাত্ত্বিক বা কুরআনিক ভিত্তি নেই।

১৬

কলম এবং শিক্ষা

📖 সূরা আল-‘আলাক (৯৬:৪–৫)

ওহীর প্রথম সূচনার জ্ঞানতত্ত্ব

পবিত্র কুরআন — বাণী

الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ۝ عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ ۝

উচ্চারণ: Alladhī ‘allama bil-qalam. ‘Allamal-insāna mā lam ya‘lam.

অর্থ: “যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন; মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।”

এখানে عَلَّمَ (শিক্ষা দেওয়া) এবং يَعْلَمْ (জানা) পাশাপাশি এসেছে। অর্থাৎ: শিক্ষা → জ্ঞান → জানা—এই গভীর সম্পর্কটি খোদ কুরআনের ভাষার মধ্যেই নিখুঁতভাবে প্রোথিত।

১৭

ইলমের পরিধি কোথায়?

কুরআনের ব্যবহারে عِلْم কখনো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে বোঝায়, কখনো নির্দিষ্ট তথ্যের জ্ঞান, কখনো কোনো বিষয়ে নিশ্চিত ও সন্দেহাতীত অবগতিকে নির্দেশ করে।

📖 সূরা আন-নিসা (৪:১৫৭)

জ্ঞান বনাম নিছক অনুমান

পবিত্র কুরআন — বাণী

مَا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ ۝

উচ্চারণ: Mā lahum bihi min ‘ilmin illā ittibā‘aẓ-ẓann.

অর্থ: “এ বিষয়ে তাদের কোনো জ্ঞান নেই; তারা শুধু অনুমানেরই অনুসরণ করে।”

এখানে عِلْم (জ্ঞান) এবং ظَنّ (যান্ন, অনুমান/ধারণা)-এর মধ্যে সুস্পষ্ট বৈপরীত্য দেখানো হয়েছে। কুরআনিক জ্ঞানতত্ত্বের মূল নীতি হলো: জ্ঞান ≠ অনুমান। কোনো ধারণা শুধু সমাজে প্রচলিত, লোকমুখে জনপ্রিয় বা পিতৃপুরুষ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হলেই তা কুরআনের দৃষ্টিতে ‘ইলম’ হিসেবে গণ্য হতে পারে না।

১৮

ইলম এবং গায়ব

কুরআনে এমন কিছু বিষয় আছে যা মানুষের ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের সীমার বাইরে:

📖 সূরা আন-নামল (২৭:৬৫)

মানবিক জ্ঞানের চূড়ান্ত সীমা

পবিত্র কুরআন — বাণী

قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ ۝

উচ্চারণ: Qul lā ya‘lamu man fis-samāwāti wal-arḍil-ghayba illallāh.

অর্থ: “বলো, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা কেউ গায়ব জানে না, আল্লাহ ছাড়া।”

এখানে يَعْلَمُ আবার জ্ঞান বা জানা অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। অতএব কুরআন মানুষের জ্ঞানের মর্যাদা স্বীকার করলেও তার চূড়ান্ত সীমাবদ্ধতাকেও সুস্পষ্ট করে: মানুষের জ্ঞান রয়েছে, কিন্তু মানুষ কখনো সর্বজ্ঞ হতে পারে না।

১৯

১২:৭৬ এবং জ্ঞানের স্তর

📖 সূরা ইউসুফ (১২:৭৬)

জ্ঞানের স্তরবিন্যাস

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَفَوْقَ كُلِّ ذِي عِلْمٍ عَلِيمٌ ۝

উচ্চারণ: Wa fawqa kulli dhī ‘ilmin ‘alīm.

অর্থ: “প্রত্যেক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির ঊর্ধ্বে রয়েছেন অধিক জ্ঞানসম্পন্ন।”

এখানে দুটি শব্দ পাশাপাশি এসেছে: ذِي عِلْمٍ (জ্ঞানের অধিকারী) এবং عَلِيم (ব্যাপক/অধিকতর জ্ঞানসম্পন্ন)। এটি জ্ঞানের স্তরবিন্যাস নির্দেশ করে। একজন জানে, আরেকজন আরও বেশি জানে; কিন্তু মানুষের জ্ঞান যতই উন্নত হোক না কেন, তা সীমাবদ্ধ।

২০

ইলম এবং বিনয়

কুরআনের জ্ঞানচর্চায় একটি অনন্য নৈতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক নীতি ঘোষণা করা হয়েছে:

⚖️ সূরা আল-ইসরা (১৭:৩৬)

জ্ঞানগত সততা ও দায়বদ্ধতা

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ۚ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا ۝

উচ্চারণ: Wa lā taqfu mā laysa laka bihi ‘ilm. Innas-sam‘a wal-baṣara wal-fu’āda kullu ulā’ika kāna ‘anhu mas’ūlā.

অর্থ: “যে বিষয়ে তোমার কোনো সুনির্দিষ্ট জ্ঞান নেই, তার পেছনে ছুটো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তঃকরণ—এদের প্রত্যেকটির ব্যাপারে কৈফিয়ত চাওয়া হবে।”

জ্ঞানতাত্ত্বিক পঞ্চস্তর

শ্রবণ (শোনা)

→

দৃষ্টি (দেখা)

→

অন্তঃকরণ (উপলব্ধি)

→

প্রকৃত জানা (ইলম)

→

নৈতিক দায়বদ্ধতা

২১

কুরআনে ‘উলামা’ কি শুধুই ধর্মীয় গোষ্ঠী?

এখন মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। কুরআনে عُلَمَاء (উলামা) শব্দটি এসেছে মাত্র দুই বিশেষ প্রসঙ্গে:

২৬:১৯৭: বনী ইসরাঈলের পূর্ববর্তী কিতাব সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ।

৩৫:২৮: প্রকৃতির বিচিত্র নিদর্শন ও সৃষ্টির রহস্য অনুধাবনের পর আল্লাহর মহত্ত্ব সম্পর্কে সচেতন জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ।

এই দুই আয়াতের কোনোটিই ‘উলামা’কে আধুনিক কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশেষ ডিগ্রি বা নির্ধারিত পোশাকের সঙ্গে সংজ্ঞায়িত করে না। তাই ভাষাতাত্ত্বিকভাবে সতর্ক সিদ্ধান্ত হবে: কুরআনিক ‘উলামা’ শব্দকে পরবর্তী যুগের সামাজিক ব্যবহারে গড়ে ওঠা ‘নির্দিষ্ট ধর্মীয় পণ্ডিত’ শ্রেণীতে সীমাবদ্ধ করে ফেলা কুরআনের সরাসরি সংজ্ঞা নয়। তবে এর বিপরীত এমন দাবিও করা যাবে না যে যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যুক্ত ব্যক্তিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কুরআনিক আলিম। কুরআন যে কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্যটি প্রতিষ্ঠা করেছে তা হলো: বাস্তব জ্ঞান এবং সেই জ্ঞানের আলোকে স্রষ্টার মহত্ত্ব ও নিদর্শন উপলব্ধি।

২২

বিজ্ঞান কি ইলমের বাইরে?

কুরআন নিজেকে আধুনিক বিজ্ঞানের পাঠ্যবই হিসেবে উপস্থাপন করে না, আবার মহাবিশ্ব ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণকে কোনোভাবেই নিষিদ্ধও করেনি। বরং আকাশ, পৃথিবী, বৃষ্টি, উদ্ভিদ, ফলমূল, পর্বতমালা, মানুষ, ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্যকে বারবার آيَات (আয়াত, নিদর্শন) হিসেবে উপস্থাপন করেছে:

📖 সূরা আর-রূম (৩০:২২)

ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْعَالِمِينَ ۝

উচ্চারণ: Wa min āyātihi khalqus-samāwāti wal-arḍi wakhtilāfu alsinatikum wa alwānikum. Inna fī dhālika la’āyātil-lil-‘ālimīn.

অর্থ: “আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।”

তাই প্রকৃতিকে জানার প্রয়াস কুরআনের জ্ঞানচেতনার বাইরে—এমন ভাবনার কোনো স্থান কুরআনে নেই। তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে: প্রকৃতি সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং কুরআনের আয়াতের তাদাব্বুর দুটি পৃথক জ্ঞানগত স্তর। একটির ওপর অন্যটিকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

২৩

ইলম, আলিম, উলামা: শব্দপরিবারের একটি মানচিত্র

মূলধাতু ع ل م (‘ayn-lām-mīm) থেকে উৎপন্ন সমগ্র শব্দপরিবারের পারস্পরিক সম্পর্ক ও কুরআনিক অবস্থানের তুলনামূলক চিত্র নিচে পূর্ণাঙ্গ ম্যাট্রিক্সে উপস্থাপন করা হলো:

আরবি রূপ

উচ্চারণ

রূপতাত্ত্বিক ধরন (Morphology)

কুরআনিক কেন্দ্রীয় অর্থ

মূল দৃষ্টান্ত

عَلِمَ

আলিমা

Form I (Past Verb)

জানল / অবগত হলো

২:১৮৭

পবিত্র কুরআন — বাণী

يَعْلَمُ

ইয়া‘লামু

Form I (Imperfect Verb)

জানে / অবগত থাকে

২:২১৬

عِلْم

ইলম

Verbal Noun (মাসদার)

জ্ঞান / নিশ্চিত জ্ঞান

২:৩২

عَلَّمَ

আল্লামা

Form II (Causative Verb)

শিক্ষা দিল / শেখাল

২:৩১

পবিত্র কুরআন — বাণী

تَعَلَّمَ

তা‘আল্লামা

Form V (Reflexive)

শিখল / শিক্ষা গ্রহণ করল

২:১০২

عَالِم

আলিম

Active Participle (اسم ফاعل)

জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি (যে জানে)

৬:৭৩

পবিত্র কুরআন — বাণী

عُلَمَاء

উলামা

Broken Plural (বহুবচন)

জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ

২৬:১৯৭, ৩৫:২৮

পবিত্র কুরআন — বাণী

عَالِمُونَ

আলিমূন

Sound Plural (সুস্থ বহুবচন)

জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ (বোধশক্তিসম্পন্ন)

২৯:৪৩

عَلِيم

আলীম

Intensive Adjective (فَعِيل)

ব্যাপক / পরিপূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন

২:২৯

عَلَّام

আল্লাম

Superlative Intensive (فَعَّال)

অদৃশ্যের জ্ঞানে পরিপূর্ণ

৫:১০৯

পবিত্র কুরআন — বাণী

مَعْلُوم

মা‘লূম

Passive Participle (اسم مفعول)

জ্ঞাত / জানা / নির্ধারিত

১৫:৩৮

২৪

পর্যবেক্ষণ, সিদ্ধান্ত এবং সীমা

গবেষণার ফলকে তিনটি সুস্পষ্ট স্তরে বিন্যস্ত করা আবশ্যক:

ক. সরাসরি টেক্সচুয়াল পর্যবেক্ষণ (Direct Observations)

ع ل م মূলধাতু কুরআনে শত শত স্থানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

عِلْم মৌলিকভাবে নিশ্চিত ‘জ্ঞান’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

عَلِمَ / يَعْلَمُ কোনো উপাধি নয়, বরং ‘জানা বা অবগত থাকা’ ক্রিয়াকে প্রকাশ করে।

عَلَّمَ ‘শিক্ষা দেওয়া’ নির্দেশ করে, যা কেবল ধর্মীয় বিষয়ে নয় বরং বস্তুগত বাস্তবতা ও ভাষার ক্ষেত্রেও প্রযুক্ত।

تَعَلَّمَ ‘শিক্ষা গ্রহণ বা শেখা’ নির্দেশ করে।

عَالِم সরাসরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে নির্দেশ করে।

عُلَمَاء কুরআনে মাত্র দুটি আয়াতে এসেছে (২৬:১৯৭ এবং ৩৫:২৮)।

৩৫:২৭–২৮-এ উলামা শব্দের বর্ণনার পূর্বে বৃষ্টি, ফলমূল, পাহাড়, মানুষ ও জীবজন্তুর বাস্তব বৈচিত্র্য বর্ণিত হয়েছে।

১৭:৩৬-এ স্পষ্ট জ্ঞান ছাড়া কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা অনুসরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

১২:৭৬-এ প্রত্যেক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির ঊর্ধ্বে অধিক জ্ঞানসম্পন্ন থাকার স্তরবিন্যাস ঘোষণা করা হয়েছে।

খ. যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত (Rational Deductions)

এসব পর্যবেক্ষণ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়: কুরআনিক ‘ইলম’কে কেবল একটি নির্দিষ্ট যুগের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার চারদেয়ালে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। কারণ কুরআনে শিক্ষা, জানা এবং জ্ঞানের প্রয়োগ মানবিক ভাষা, কারিগরি শিল্প এবং প্রাকৃতিক নিদর্শনের মতো বহুমুখী বাস্তব ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত।

গ. যে সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না (Epistemic Boundaries)

💡 সারসংক্ষেপ ও বার্তা

“প্রত্যেক বিজ্ঞানীই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কুরআনের আলিম”—এমন কোনো সরলীকরণ কুরআন করেনি। কারণ শুধু তথ্য জানা নয়, স্রষ্টার প্রতি সম্ভ্রম ও চেতনা এখানে অপরিহার্য।

💡 সারসংক্ষেপ ও বার্তা

“শুধুমাত্র প্রচলিত শিক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিই আলেম”—কুরআনে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক একচেটিয়া সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি।

✅ ভারসাম্যপূর্ণ কুরআনিক সিদ্ধান্ত: ‘আলিম’ ও ‘উলামা’ পরিচয়ের মূল কষ্টিপাথর হলো ‘জ্ঞান’, এবং ৩৫:২৮ অনুযায়ী সেই জ্ঞান বাস্তব জগতের নিদর্শন অনুধাবন ও অন্তরের সম্ভ্রমের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য।

২৫

শেষ কথা: ইলম একটি উপাধি নয়, একটি জ্ঞানগত অবস্থান

‘ইলম’কে যদি কেবল একটি সামাজিক উপাধিতে পরিণত করা হয়, তবে শব্দটির কুরআনিক বিশালতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে যায়।

কুরআনিক শব্দপরিবারের অভ্যন্তরীণ গতিধারা

জানা (عَلِمَ)

→

শিক্ষা দেওয়া (عَلَّمَ)

→

পবিত্র কুরআন — বাণী

শেখা (تَعَلَّمَ)

→

জ্ঞান (عِلْم)

→

পবিত্র কুরআন — বাণী

জ্ঞানসম্পন্নতা (عَالِم / عُلَمَاء)

কিন্তু সেই জ্ঞানেরও সীমা রয়েছে। তাই কুরআনের সবচেয়ে গভীর ও স্থায়ী স্মারকগুলোর একটি:

পবিত্র কুরআন — বাণী

وَفَوْقَ كُلِّ ذِي عِلْمٍ عَلِيمٌ ۝

উচ্চারণ: Wa fawqa kulli dhī ‘ilmin ‘alīm.

“প্রত্যেক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির ঊর্ধ্বে রয়েছেন অধিক জ্ঞানসম্পন্ন।”

জ্ঞান মানুষকে মহিমান্বিত করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে নিজের ক্ষুদ্রতা ও সীমানাও স্মরণ করিয়ে দেয়। আর সেই সীমা অকপটে স্বীকার করাই প্রকৃত জ্ঞানচর্চার প্রথম ও প্রধান শর্ত।

📜

কুরআনিক জ্ঞানতত্ত্বের শিক্ষা

•

কুরআন শুধু জানতে বলে না; যা জানি না, তা বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করতেও শেখায়।

•

শুধু শিখতে বলে না; কী শিখছি এবং তার নৈতিক ও ব্যবহারিক ফল কী, তা পর্যবেক্ষণ করতে বলে।

•

শুধু প্রকৃতি দেখতে বলে না; সৃষ্টির বৈচিত্র্যের মাঝে স্রষ্টার মহত্ত্বের জীবন্ত নিদর্শন চিনতে বলে।

•

শুধু শব্দ পাঠ করতে বলে না; শব্দের রূপতাত্ত্বিক উৎস ও পারস্পরিক কুরআনিক সম্পর্ক হৃদয়ঙ্গম করতে বলে।

মানুষের তৈরি পরিচয় যুগে যুগে বদলাতে পারে, প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞাও পরিবর্তিত হতে পারে, শব্দের সামাজিক ব্যবহারও রূপান্তর হতে পারে—কিন্তু কুরআনের কোনো শব্দের প্রকৃত ও শাশ্বত অর্থ অনুসন্ধানের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো: শব্দটি কুরআন নিজে কোথায়, কীভাবে এবং কোন প্রসঙ্গে ব্যবহার করেছে। সেখান থেকেই শুরু হয় খাঁটি ইলমের যাত্রা।

পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।