ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট
পবিত্র কুরআনের অনেক প্রচলিত বাংলা অনুবাদে “فَلَا أُقْسِمُ” (ফালা উকসিমু), “لَا أُقْسِمُ” (লা উকসিমু) কিংবা কসমের হরফ হিসেবে পরিচিত “و” (ওয়া)-কে “আমি শপথ করছি”, “কসম করছি” বা “শপথ” হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে। কিন্তু এই আয়াতগুলোর গভীর প্রেক্ষাপট ও মূল উদ্দেশ্য লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এগুলোতে প্রচলিত গৎবাঁধা অর্থের চেয়ে গভীর এক চিন্তার খোরাক রয়েছে।
মহান আল্লাহ তাআলা নিজেই সমস্ত সৃষ্টির একমাত্র স্রষ্টা। নক্ষত্র, গোধূলি, নগর, রাত, দিন, সূর্য, চন্দ্র বা মানুষের আত্মা—এগুলো সবই তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি। সার্বভৌম ও পরম ক্ষমতার অধিকারী স্রষ্টা তাঁর নিজেরই সৃষ্ট কোনো বস্তুর নামে মানুষের মতো কসম বা শপথ করবেন, তা তাঁর ঐশ্বরিক মহত্ত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং এসব আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির অনন্য নিদর্শনগুলোর প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—মানুষ যেন এই প্রাকৃতিক ও আধ্যাত্মিক নিদর্শনগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে, মহাজাগতিক বিন্যাস উপলব্ধি করে এবং স্রষ্টার কুদরত সম্পর্কে সচেতন হয়।
সার্বভৌম ও পরম ক্ষমতার অধিকারী স্রষ্টা কোনো সৃষ্টির নামে শপথ করেন না; বরং তিনি মহাজাগতিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিদর্শনের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে গভীর চিন্তাভাবনা ও গবেষণার উদাত্ত আহ্বান জানান।
তাই এই নিবন্ধে সেই আয়াতগুলোর একটি যুক্তিগ্রাহ্য নতুন অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো, যেখানে “শপথ” শব্দটি পরিহার করে “দৃষ্টি দাও”, “লক্ষ্য করো” বা “চিন্তা করো” অর্থে অনুবাদ সাজানো হয়েছে।
নতুন অনুবাদ: দৃষ্টি আকর্ষণ ও নিদর্শনের ভাবার্থ
| সূরা ও আয়াত | মূল আরবি পাঠ | প্রস্তাবিত নতুন অনুবাদ |
|---|---|---|
| আল-ওয়াকিয়া ৫৬:৭৫ | فَلَا أُقْسِمُ بِمَوَاقِعِ النُّجُومِ | অতএব, নক্ষত্রসমূহের অবস্থানগুলোর দিকে দৃষ্টি দাও। |
| আল-ওয়াকিয়া ৫৬:৭৬ | وَإِنَّهُ لَقَسَمٌ لَّوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ | আর নিশ্চয়ই তা এক মহৎ বিভাজন/বিন্যাস, যদি তোমরা জানতে। |
| আল-হাক্কাহ ৬৯:৩৮ | فَلَا أُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُونَ | অতএব, তোমরা যা দেখতে পাও তার দিকে দৃষ্টি দাও। |
| আল-হাক্কাহ ৬৯:৩৯ | وَمَا لَا تُبْصِرُونَ | এবং যা তোমরা দেখতে পাও না তার প্রতিও। |
| আল-মাআরিজ ৭০:৪০ | فَلَا أُقْسِمُ بِرَبِّ الْمَشَارِقِ وَالْمَغَارِبِ | অতএব, পূর্ব ও পশ্চিমের প্রতিপালকের দিকে লক্ষ্য করো। |
| আল-কিয়ামাহ ৭৫:১ | لَا أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ | উত্থান ও জবাবদিহিতার দিনটির প্রতি মনোযোগ দাও। (Reflect upon the Day of Rising and Accountability.) |
| আল-কিয়ামাহ ৭৫:২ | وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّামَةِ | আর (নিজের ভেতরের) সেই অনুতপ্ত ও আত্ম-সচেতন বিবেকের দিকে মনোযোগ দাও। (And contemplate that self-accusing and conscious soul within.) |
| আত-তাকভীর ৮১:১৫ | فَلَا أُقْسِمُ بِالْخُنَّسِ | অতএব, পিছনে সরে যাওয়া নক্ষত্রগুলোর দিকে লক্ষ্য করো। |
| আল-ইনশিকাক ৮৪:১৬ | فَلَا أُقْسِمُ بِالشَّفَقِ | অতএব, গোধূলির দিকে লক্ষ্য করো। |
| আল-বালাদ ৯০:১ | لَا أُقْسِمُ بِهَٰذَا الْبَلَدِ | (কাফিরদের ধারণা ভেঙে দিয়ে) না, বরং তোমরা এই নগরের দিকে লক্ষ্য করো। |
| আল-লাইল ৯২:১ | وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى | আচ্ছন্নকারী বা ঢেকে ফেলা রাতের দিকে লক্ষ্য করো। |
| আল-লাইল ৯২:২ | وَالنَّهَارِ إِذَا تَجَلَّى | আর উদ্ভাসিত বা আলোকিত দিনের দিকে লক্ষ্য করো। |
| আদ-দুহা ৯৩:১ | وَالضُّحَى | পূর্বাহ্নের রোদ বা দিনের আলোর প্রসারের দিকে লক্ষ্য করো। |
| আদ-দুহা ৯৩:২ | وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَى | আর রাতের দিকে লক্ষ্য করো যখন তা নিঝুম হয়ে যায়। |
| আশ-শামস ৯১:১ | وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا | সূর্য এবং তার উজ্জ্বল কিরণের দিকে লক্ষ্য করো। |
| আশ-শামস ৯১:২ | وَالْقَمَرِ إِذَا تَلَاهَا | আর চাঁদের দিকে লক্ষ্য করো যখন তা সূর্যের পশ্চাতে আসে। |
فَلَا أُقْسِمُ بِمَوَاقِعِ النُّجُومِ وَإِنَّهُ لَقَسَمٌ لَّوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ
নতুন অনুবাদ ও ভাবার্থ:
“অতএব, নক্ষত্রসমূহের অবস্থানগুলোর দিকে দৃষ্টি দাও। আর নিশ্চয়ই তা এক মহৎ বিভাজন/বিন্যাস, যদি তোমরা জানতে।”
لَا أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ
নতুন অনুবাদ ও ভাবার্থ:
“(৭৫:১) উত্থান ও জবাবদিহিতার দিনটির প্রতি মনোযোগ দাও। (Reflect upon the Day of Rising and Accountability.)”
“(৭৫:২) আর (নিজের ভেতরের) সেই অনুতপ্ত ও আত্ম-সচেতন বিবেকের দিকে মনোযোগ দাও। (And contemplate that self-accusing and conscious soul within.)”
ব্যাখ্যা ও ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ
১. নিদর্শন বনাম শপথ: স্বয়ংস্পষ্ট সত্যের উপস্থাপন
উপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ ও নিয়মের অবতারণা করেছেন—যেমন নক্ষত্রের কক্ষপথ, মহাপ্রলয়, মানুষের মনস্তত্ত্ব, সূর্য-চন্দ্রের আবর্তন, এবং দিন ও রাতের বৈজ্ঞানিক ক্রমান্বয়। এগুলো প্রতিটিই আল্লাহর অস্তিত্বের জীবন্ত প্রমাণ। সত্য যেখানে স্বয়ং স্পষ্ট, সেখানে সত্যতা প্রমাণের জন্য আলাদা কোনো শপথের আবশ্যকতা থাকে না। বরং প্রধান কাজ হলো এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের দিকে মানুষের মনকে ধাবিত করা।
২. হরফ 'ওয়া' (و) এবং 'লা' (لَا)-এর ব্যাকরণগত দৃষ্টিভঙ্গি
আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী, “لَا أُقْسِمُ” বা “فَلَا أُقْسِمُ”-এর শুরুতে থাকা “لَا” (লা)-কে যদি নেতিবাচক বা পূর্ববর্তী কোনো ভ্রান্ত ধারণার খণ্ডন অর্থে নেওয়া হয়, তবে অর্থ দাঁড়ায়: “আমি শপথ করছি না” বা “এখানে শপথের কোনো প্রয়োজন নেই।” যেমন সূরা আল-বালাদের শুরুতে এই 'লা' দিয়ে কাফিরদের এই ভ্রান্ত ধারণাকে খণ্ডন করা হয়েছে যে দুনিয়ার জীবনই শেষ।
একইভাবে সূরা আল-লাইল, আদ-দুহা এবং আশ-শামস-এর শুরুতে ব্যবহৃত হরফ “و” (ওয়া)-কে কসম বা শপথের অর্থ না দিয়ে, সেটিকে মনোযোগ আকর্ষণের সূচনা বা "অবস্থার প্রতি ইঙ্গিতকারী হরফ" হিসেবে দেখলে অর্থটি অনেক বেশি সাবলীল হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহ মূলত রাত, দিন, সূর্য বা চাঁদের মতো মহাজাগতিক কাঠামোর দিকে মানুষের চিন্তাশক্তিকে খাটাতে বলেছেন।
উপসংহার ও চিন্তাশীলতার আহ্বান
কুরআনের এই আয়াতগুলো মানবজাতিকে অন্ধ অনুকরণ ছেড়ে এক গভীর বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাশীলতার দিকে আহ্বান করে। শপথের প্রচলিত অনুবাদে যে একধরনের মানবিক সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায়, তা এই ঐশ্বরিক বাণীর মূল সুরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নতুন অনুবাদে “শপথ” পরিহার করে “দৃষ্টি দাও” বা “লক্ষ্য করো” শব্দবন্ধের ব্যবহার কুরআনের সার্বজনীন, যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও নিখুঁত, আধুনিক এবং হৃদয়গ্রাহী করে তোলে।

