🔬 ভাষাতাত্ত্বিক ও শব্দমূল গবেষণা
লেখক: আলম এম.
“কসম” শব্দটি আসলে কী? সূরা আল-বালাদ (৯০:১) ও ‘লা উক্বসিমু’-এর ধাতুভিত্তিক সত্য
لَآ أُقۡسِمُ بِهَٰذَا ٱلۡبَلَدِ (Surah Al-Balad 90:1)
প্রচলিত অনুবাদ: “আমি এই নগরীর কসম করছি”
“কসম” শব্দটি আসলে কী — এটা বোঝার জন্য ৯০:১ নম্বর আয়াতটির মূল ধাতু (Root) ধরে দেখতে হবে। আল্লাহ কি সৃষ্টির কসম খান? প্রচলিত অনুবাদে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, রুট বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার পর্দা উন্মোচিত হয়।
১
“কসম” শব্দের Root বিশ্লেষণ
এখানে মূল ক্রিয়াপদ হলো uqsimu (أُقْسِمُ), যার রুট: qa-sa-ma (ق س م)।
ভাগ করা (Divide)
কোনো বিষয়কে স্পষ্ট সীমানায় পৃথক করা।
বণ্টন করা (Distribute)
যেমন: 'তাকসীম' (تقسيم = বণ্টন)।
নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ
যেমন: 'কিসম' (قِسْم = নির্দিষ্ট অংশ)।
“কসম করা” অর্থটি কীভাবে এলো? আরবি ভাষায় যখন কেউ “uqsimu” বলে, তখন তার মূল ভাব দাঁড়ায়: “আমি একটি বিষয়কে সুনির্দিষ্টভাবে ভাগ ও সীমানা নির্ধারণ করে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করছি।” এটি পরবর্তীতে শপথ (oath) অর্থে রূপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, কারণ শপথ মানে কোনো কথাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মূল ধাতুটিতে মানুষের মতো “কসম খাওয়া” সরাসরি নেই।
২
“لَا أُقْسِمُ” — এখানে “লা” (لَا) কেন?
এটি আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আক্ষরিকভাবে মনে হতে পারে “না, আমি কসম করছি না”। কিন্তু কুরআনিক ব্যাকরণে এখানে “لا” (lā) সাধারণ না-বাচক নয়; বরং এটি ভুল ধারণা প্রত্যাখ্যানপূর্বক পরম জোর দেওয়া (Emphasis & Refutation)।
কুরআনে এই শৈলী বহুবার এসেছে (৫৬:৭৫, ৭৫:১):
“না (তোমরা যেমন ভ্রান্ত ধারণা করছ তেমনটি নয়), বরং আমি এই বিষয়টিকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ও অকাট্যভাবে প্রতিষ্ঠা করছি...”
৩
নগরীর অর্থ ও প্রচলিত অনুবাদের সমস্যা
বা-লাদ (ب ل د): ভূমি, নগর বা মানব বসতি। এটি একটি বাস্তব ভৌগোলিক বাস্তবতা — কিন্তু সেটিকে মানুষের মতো “শপথের বস্তু” বানানো বিভ্রান্তিকর।
প্রচলিত অনুবাদের ৩টি মৌলিক সমস্যা:
“কসম খাওয়া” ধারণাটি রুট ধাতু (ق-س-ম) থেকে সরাসরি আসে না।
এতে মনে হয় আল্লাহ কোনো সৃষ্টির নামে মানুষের মতো শপথ নিচ্ছেন।
এতে অসঙ্গত প্রশ্ন ওঠে — আল্লাহ কেন তাঁর নিজের সৃষ্টির কসম খাবেন? (যা ৪:৮২ এর পরিপন্থী)।
৪
Core Meaning অনুযায়ী পুনর্গঠন ও অনুবাদ
সূরা আল-বালাদ (৯০:১) — Core Meaning অনুবাদ:
“না, (তোমাদের ধারণা সঠিক নয়); আমি এই নগরকে সামনে রেখে বাস্তব সত্যকে স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা ও সাক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরছি।”
আয়াতের ধারাবাহিক তাৎপর্য (৯০:২-৩): পরবর্তী আয়াতগুলোতে মানুষের জন্মগত সংগ্রাম, নৈতিক পরীক্ষা ও মক্কার বাস্তবতা আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ এটি কোনো আনুষ্ঠানিক “শপথ” নয়, বরং একটি বাস্তব ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক প্রমাণকে সামনে এনে পরম সত্যকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।
🏁 উপসংহার: সত্যের দৃঢ় ঘোষণা
“কসম” শব্দটি প্রচলিত অনুবাদে ব্যবহৃত হলেও, তা আয়াতের মূল বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক ধারণাকে ধারণ করে না। কুরআন এখানে কোনো সৃষ্টির নামে শপথ করছে না; বরং সৃষ্ট প্রমাণ ও বাস্তবতাকে সামনে এনে এক অবিনশ্বর সত্যকে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করছে।
© আলম (Alam M)
কুরআনিক শব্দমূল ও তাত্ত্বিক ব্যাকরণ সিরিজ · সূরা ৯০:১

