সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে মানুষের রাগ, ক্ষোভ ও অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে সম্পৃক্ততা (Engagement) বাড়ানোর যে বাণিজ্যিক কৌশল—তার নাম Rage Baiting। আমাদের ক্ষোভ কীভাবে অ্যালগরিদমের জ্বালানি আর অন্যের উপার্জনের উৎসে পরিণত হচ্ছে এবং কীভাবে আমরা এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারি, তার এক গভীর পর্যালোচনা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কখনো কখনো এমন কিছু বক্তব্য, ছবি কিংবা ভিডিও আমাদের সামনে আসে, যা মুহূর্তের মধ্যে ক্ষুব্ধ করে তোলে। বিশেষ করে ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব কিংবা কোনো জনগোষ্ঠীর অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন বিষয়গুলো আমাদের সহজেই উত্তেজিত করে। আমরা অনেক সময় রাগের মাথায় মন্তব্য করি, প্রতিবাদ জানাই, ভিডিওটি শেয়ার করি কিংবা অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে দিই।
কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখি, আমাদের এই প্রতিক্রিয়ার ফলে প্রকৃতপক্ষে কার লাভ হচ্ছে?
“হতে পারে, যে বক্তব্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমরা এতটা সময় ও আবেগ ব্যয় করছি, সেই বক্তব্যের নির্মাতাই আমাদের প্রতিক্রিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন। আমাদের ক্ষোভ তাঁর প্রচারের মাধ্যম হয়ে উঠছে, আমাদের প্রতিবাদ তাঁর ভিডিওর দর্শক বাড়াচ্ছে, আর আমাদের আবেগ তাঁর উপার্জনের নতুন সুযোগ তৈরি করছে।”
এখানেই লুকিয়ে আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ও বাণিজ্যিক কৌশল, যার নাম Rage Baiting (রেজ বেইটিং)। অর্থাৎ, সুপরিকল্পিতভাবে মানুষের রাগ, ক্ষোভ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া উসকে দিয়ে অধিকতর মনোযোগ ও সম্পৃক্ততা অর্জন করা।
আবেগ যখন ব্যবসার পুঁজি
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বিখ্যাত উপন্যাস লালসালু-র মজিদ চরিত্রটি আমাদের একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। মানুষের সরল বিশ্বাস, অজ্ঞতা ও ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে কীভাবে ব্যক্তিগত আধিপত্য ও স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করা যায়, উপন্যাসটিতে তার একটি বাস্তব রূপ ফুটে উঠেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মানুষের আবেগকে পুঁজি করে স্বার্থসিদ্ধির মূল মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাটি বদলায়নি। আগে মানুষের বিশ্বাস ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে সরাসরি সামাজিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা হতো; বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সেই আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম এবং জটিল বিজ্ঞাপনভিত্তিক অর্থনীতি।
ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো কনটেন্ট কতবার দেখা হচ্ছে, কতজন মন্তব্য করছে, কতবার শেয়ার হচ্ছে এবং দর্শক কতক্ষণ সেটির সঙ্গে যুক্ত থাকছে—এসব বিষয় কনটেন্টের বিস্তারে প্রধান ভূমিকা রাখে। প্রযুক্তি পরিভাষায় এই সম্পৃক্ততাকে বলা হয় Engagement।
কোনো কনটেন্টের প্রতি মানুষের ইতিবাচক আগ্রহ যেমন সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারে, তেমনি তীব্র রাগ, ক্ষোভ, বিরক্তি কিংবা প্রতিবাদও ঠিক একইভাবে সম্পৃক্ততা বাড়ায়। ফলে কোনো বক্তব্যকে দর্শক সমর্থন করছেন, নাকি তার বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছেন—তা অ্যালগরিদমের কাছে মুখ্য নয়। ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়াই মূলত কনটেন্টটিকে সবার ফিডে ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখে।
এই কঠিন বাস্তবতাকে সুচারুভাবে কাজে লাগিয়েই Rage Baiting বর্তমান ডিজিটাল যুগে এক অবিশ্বাস্য কার্যকর বাণিজ্যিক প্রচারকৌশলে পরিণত হয়েছে।
মানুষের রাগ কেন এত কার্যকর?
মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজের বিশ্বাস, পরিচয় ও মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বক্তব্য দেখলে প্রতিক্রিয়া জানাতে চায়। বিশেষ করে যখন কোনো বক্তব্য তার ধর্মীয় বা সামাজিক আত্মপরিচয়কে সরাসরি আঘাত করে, তখন সেই প্রতিক্রিয়া আরও বহুগুণ তীব্র হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানে মানুষের এই প্রবণতার সঙ্গে গোষ্ঠীগত পরিচয় (Tribal Identity) ও সামাজিক বিভাজনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ অনেক সময় নিজের গোষ্ঠীকে ইতিবাচকভাবে এবং বিপরীত গোষ্ঠীকে নেতিবাচকভাবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন কোনো বক্তব্যের সত্যতা ও যুক্তি যাচাই করার আগেই বক্তার বাহ্যিক পরিচয় কিংবা অবস্থান তার প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করতে শুরু করে।
২০২১ সালে বিশ্বখ্যাত Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS) সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ফেসবুক ও টুইটারের প্রায় ২৭ লাখ পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়—রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত বিরোধ এবং উসকানিমূলক ভাষা পোস্টের ভাইরাল বিস্তারকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করে। গবেষণার বিষয় সরাসরি ধর্মীয় কনটেন্ট না হলেও এটি প্রমাণ করে যে, প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে তৈরি বিরোধপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বাধিক গতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
ধর্মীয় বিরোধের ক্ষেত্রেও একই মনস্তাত্ত্বিক ফর্মুলা কাজ করে। ধরা যাক, কেউ এমন একটি ভিডিও প্রকাশ করল, যার শিরোনাম বা থাম্বনেইল কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের ক্ষুব্ধ করার মতো করে সুপরিকল্পিতভাবে সাজানো। ভিডিওটি দেখার পর হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদ জানালেন, গালাগালি করলেন, পাল্টা ভিডিও বানালেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে অন্যদের দেখতে বললেন।
প্রত্যেকেই হয়তো মনে করছেন, তাঁরা বক্তব্যটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন এবং অন্যায়কে প্রতিহত করছেন। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের কাছে এই প্রতিটি ক্লিক, কমেন্ট আর শেয়ার ভিডিওটির এনগেজমেন্ট বাড়িয়ে আকাশচুম্বী করে দেয়। ফলে নির্মাতা পান অধিক দর্শকসংখ্যা, প্রচুর বিজ্ঞাপন আয় এবং রাতারাতি পরিচিতি।
অর্থাৎ, যে কনটেন্টকে প্রতিহত করার জন্য মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, সেই প্রতিক্রিয়াই প্রকারান্তরে কনটেন্টটির সার্বিক বিপণন ও সফল প্রচারে পূর্ণ সহায়তা করছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর উসকানিমূলক ব্যবসা এক বিষয় নয়
পৃথিবীতে আস্তিক ও নাস্তিক, বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী এবং নানা দর্শনে বিশ্বাসী মানুষের সহাবস্থান রয়েছে। প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্বাস, অবিশ্বাস ও মার্জিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা স্বাভাবিক ও সুস্থ সমাজের দাবি।
কেউ ধর্মবিশ্বাসী না হলেই তিনি ধর্মবিদ্বেষী, এমন সরলীকৃত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। একইভাবে কেউ ধর্মবিশ্বাসী হলেই তাঁর সব বক্তব্য বা আচরণ সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে যায় না। ধর্ম, দর্শন কিংবা যেকোনো মতবাদ নিয়ে প্রশ্ন তোলা, যুক্তি উপস্থাপন করা এবং নির্মোহ সমালোচনা করা সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজচর্চারই স্বাভাবিক অংশ।
✓ বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা
কোনো ধারণার যুক্তিগত দুর্বলতা ও অসংগতি তথ্যপ্রমাণ সহকারে শালীন ভাষায় তুলে ধরা। লক্ষ্য থাকে সত্যের অন্বেষণ ও সুস্থ জ্ঞানচর্চা।
✗ উসকানিমূলক উদ্দেশ্য (Rage Bait)
একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর আবেগে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত দিয়ে বারবার ক্ষোভ তৈরি করা, যাতে তারা গালাগালি ও প্রতিবাদ করে ভিডিওর ভিউ বাড়িয়ে দেয়।
এখানে নির্মাতার ব্যক্তিগত বিশ্বাস কী—তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর কনটেন্টের ধরন, উপস্থাপনার ভাষা এবং এই পুনরাবৃত্ত বাণিজ্যিক আচরণ। নিজের মতপ্রকাশ করতে গিয়ে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো কিংবা মানুষের পবিত্র অনুভূতিকে সস্তা বাণিজ্যিক সুবিধার পণ্য বানানো কোনোভাবেই সুস্থ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হতে পারে না।
বিভাজনের রাজনীতি: লাভবান হয় কে?
মানুষকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বিভক্ত করার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার কৌশল ইতিহাসে নতুন নয়। এটি হলো সুপরিচিত Divide and Rule (বিভক্ত করো ও শাসন করো) নীতির আধুনিক ডিজিটাল সংস্করণ।
⚙ ডিজিটাল বিভাজনের ধাপে ধাপে নির্মাণ প্রক্রিয়া:
- ক. প্রথমে মানুষকে দুটি বিপরীত অন্ধ শিবিরে ভাগ করা হয়।
- খ. এরপর এক পক্ষকে অন্য পক্ষের অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা হয়।
- গ. ক্রমাগত ভয়, সন্দেহ ও বিষবাষ্প ছড়িয়ে উভয় পক্ষের ভেতর পাল্টাপাল্টি সংঘাত জিইয়ে রাখা হয়।
- ঘ. ফলস্বরূপ, বৃহত্তর নৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নগুলো হারিয়ে যায় এবং মানুষ অনর্থক কাদা-ছোড়াছুড়িতেই মেতে থাকে।
একটি ধর্মের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রকাশিত হলে একদল মানুষ সেটিকে সমর্থন করে, অন্যদল প্রতিবাদ করে। আবার অন্য কোনো ধর্ম বা মতাদর্শকে লক্ষ্য করে একই ধরনের বক্তব্য প্রকাশিত হলে পক্ষগুলোর অবস্থানও পাল্টে যায়। এভাবে মানুষ বক্তব্যের সত্যতা, যুক্তি ও গভীর উদ্দেশ্য যাচাই না করে বক্তার অন্ধ দলগত পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে।
ফুটবল স্টেডিয়ামের কথাই ধরা যাক। দুই দলের কট্টর সমর্থকদের মধ্যে যত বেশি উন্মাদনা ও শত্রুভাবাপন্ন উত্তেজনা থাকে, ম্যাচের টিকিট বিক্রি, টিভি রেটিং ও সংশ্লিষ্ট স্পনসরদের মুনাফা তত তুঙ্গে ওঠে। ডিজিটাল জগতেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে এই দর্শকে পরিণত করা হচ্ছে। দিনশেষে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় সাধারণ মানুষের—যাঁরা টেরও পান না যে তাঁদের অকৃত্রিম অনুভূতি অন্য কারও ক্যাশ-ইন মেশিনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার আগে নিজের অবস্থান যাচাই করা জরুরি
এই জটিল বাণিজ্যিক চক্র ভাঙার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো—নিজের আবেগ ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কোনো উসকানিমূলক কনটেন্ট দেখলেই মন্তব্যের ঘরে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে কিংবা প্রতিবাদ ছড়িয়ে দিতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
১ অপ্রয়োজনীয় অর্থহীন তর্ক এড়িয়ে চলুন
কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনাকর বক্তব্য প্রকাশ করে, তবে তার সঙ্গে কমেন্টে গালাগালি বা অর্থহীন বিতর্কে জড়াবেন না। আপনার প্রতিটি ক্ষুব্ধ মন্তব্য প্ল্যাটফর্মের চোখে ওই ভিডিওর সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে দেয়।
২ অ্যালগরিদমকে নিজের পছন্দ জানান
ইউটিউব বা ফেসবুকে কোনো চ্যানেল বা বিষাক্ত কনটেন্ট দেখতে না চাইলে রাগে ফেটে না পড়ে সোজা Not Interested কিংবা Don't Recommend Channel অপশনটি চেপে দিন। এতে নিজের ফিডে অনাকাঙ্ক্ষিত কনটেন্টের উপস্থিতি কমাতে স্থায়ী সাহায্য হবে।
৩ ক্ষোভের বশে শেয়ার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করুন
কোনো বক্তব্যের প্রতিবাদ করার উদ্দেশ্যে সেটি শেয়ার করলেও তা নতুন শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই শুধু ক্ষোভ প্রকাশের জন্য কোনো কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
❓ ৪. শেয়ার করার আগে নিজেকে ৩টি প্রশ্ন করুন:
- এই কনটেন্টটি কে তৈরি করেছে?
- এটি তৈরির নেপথ্য উদ্দেশ্য কী হতে পারে?
- আমি এটি শেয়ার করলে শেষ পর্যন্ত কার লাভ হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলো অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ও অবিবেচনাপ্রসূত প্রতিক্রিয়া থেকে আমাদের বিরত রাখতে পারে।
৫ প্রয়োজন হলে মার্জিত ও যুক্তিনির্ভর সমালোচনা করুন
কোনো বক্তব্যে ভুল তথ্য, অসংগতি কিংবা যুক্তিগত দুর্বলতা থাকলে তার প্রতিবাদ করা অবশ্যই যৌক্তিক। তবে সেই প্রতিবাদ হওয়া উচিত তথ্যনির্ভর, মার্জিত ও সুসংগঠিত। ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা পাল্টা অপমান দিয়ে কোনো বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করা যায় না। নীরবতা সব পরিস্থিতিতে সমাধান নয়—তবে যেখানে প্রতিক্রিয়া জানানো মানেই উসকানিদাতার বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য পূরণে সহায়তা করা, সেখানে প্রতিক্রিয়া না দেওয়াও একটি সচেতন বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত।
সচেতনতা ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়
এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে—যাঁরা মানুষকে উসকানিমূলক কনটেন্ট উপেক্ষা করতে বলছেন, তাঁদের নিজেদেরই বা এ বিষয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন কেন? কারণ কোনো বিষয় নিছক উপেক্ষা করা এবং সেই পুরো ব্যবস্থার কৌশল সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এক নয়। কোনো একটি ক্ষতিকর সামাজিক প্রবণতা সম্পর্কে মানুষকে জানানো প্রয়োজন, যাতে তারা পরবর্তী সময়ে নিজেরাই এর অভ্যন্তরীণ ফাঁদ চিনতে পারে।
একজন মানুষ আস্তিক হতে পারেন, নাস্তিক হতে পারেন, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান হতে পারেন। প্রত্যেকের বিশ্বাস ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। সেই স্বাধীনতা রক্ষা করার পাশাপাশি অন্যের বিশ্বাস ও মানবিক মর্যাদার প্রতিও সম্মান দেখানো প্রয়োজন। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কোনো ধর্মীয় বক্তব্য, সামাজিক ধারণা কিংবা প্রচলিত বিশ্বাসের নির্মোহ সমালোচনাও করা যেতে পারে—কিন্তু মতপার্থক্যকে অন্ধ বিদ্বেষে রূপান্তরিত করার কোনো প্রয়োজন নেই।
দিনশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক নই। আমাদের প্রতিটি ক্লিক, মন্তব্য, ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এবং শেয়ার এই ডিজিটাল অর্থনীতির অত্যন্ত কার্যকর অংশ।
আমাদের বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু সেই পার্থক্যকে পুঁজি করে কেউ যেন আমাদের মধ্যে বিদ্বেষ ও বিভাজন ছড়িয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সেই সচেতনতা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

