মুতাশাবিহ - মানে সর্বদাই সাদৃশ্য, সংগতিপূর্ণতা? নাকি রূপকও (metaphor) হতে পারে?

আলম এম.আলম এম.২৮ আগস্ট, ২০২৬

কুরআনের ভাষাগত বহুমাত্রিকতা ও ৪:৮২-এর সমন্বয়নীতি:

কুরআন নিজেই ঘোষণা দেয় -

সূরা নিসা ৪:৮২

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا

অনুবাদ: তারা কি কুরআন গভীরভাবে চিন্তা করে না? যদি এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে বহু বৈপরীত্য পেত।

💡 সারসংক্ষেপ ও বার্তা

এই আয়াত কুরআন বোঝার একটি কঠোর মানদণ্ড স্থাপন করে। কুরআনের কোনো শব্দ বা ধারণাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না, যাতে কুরআনের অন্য আয়াতের সাথে প্রকৃত বৈপরীত্য তৈরি হয়।

এই নীতির আলোকে “মুতাশাবিহ” শব্দটি কী বোঝায়, তা একমাত্রিকভাবে নয়, বরং কুরআনের সামগ্রিক ব্যবহারের আলোকে বুঝতে হয়।

"মুতাশাবিহ” শব্দের মূল ধারণা:

পবিত্র কুরআন — বাণী

مُتَشَابِه / مُتَشَابِهَات

রুট: ش ب ه

এই রুটের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো: মিল বা সাদৃশ্য - এমন মিল, যা মানুষকে প্রথমে আক্ষরিক বা পরিচিত অর্থের দিকে টানলেও অর্থ নির্ধারণে সতর্কতা প্রয়োজন হয়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো -

পবিত্র কুরআন — বাণী

تَشَابِهَات

রুট ش ب ه নিজে “রূপক” শব্দ নয়, কিন্তু এটি এমন ভাষার ক্ষেত্র তৈরি করে, যেখানে আক্ষরিক সাদৃশ্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।

💡 সারসংক্ষেপ ও বার্তা

অতএব, মুতাশাবিহ মানে কেবল - “সাদৃশ্যপূর্ণ” বললেই শেষ হয়ে যায় না।

মুতাশাবিহ কখন সাদৃশ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে?

কুরআনে বহু জায়গায় মুতাশাবিহ স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য সাদৃশ্য বোঝায়।

সূরা বাকারা ২:২৫

وَأُتُوا بِهِ مُتَشَابِهًا

অনুবাদ: এবং তাদেরকে এমন ফল দেওয়া হবে, যা দেখতে একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

জান্নাতের ফল দেখতে একরকম মনে হয়। এখানে ফল ফলই, অন্য কিছুর প্রতীক নয়। অর্থাৎ -

~সাদৃশ্য বাস্তব

~অর্থ আক্ষরিক

💡 সারসংক্ষেপ ও বার্তা

রূপকের প্রয়োজন নেই।

সূরা আনআম ৬:৯৯

مُتَشَابِهًا وَغَيْرَ مُتَشَابِهٍ

অনুবাদ: কিছু একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, আবার কিছু সাদৃশ্যপূর্ণ নয়।

কিছু ফল দেখতে মিল আছে, কিছুতে নেই। এখানে মুতাশাবিহ পুরোপুরি পর্যবেক্ষণযোগ্য মিল।

এই ধরনের আয়াতে -

মুতাশাবিহ = সাদৃশ্যপূর্ণ, সংগতিপূর্ণ।

কিন্তু মুতাশাবিহ সবসময় আক্ষরিক সাদৃশ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কুরআনে এমন আয়াতও আছে, যেখানে - শব্দে সাদৃশ্য আছে, কিন্তু আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করলে আল্লাহ সম্পর্কে সীমাবদ্ধতা বা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য আরোপ হয় - যা অন্য আয়াতের সাথে সংঘর্ষ তৈরি করে। এই অবস্থায় ৪:৮২ অনুসারে আক্ষরিক সাদৃশ্যে থেমে থাকা বৈধ নয়।

আলো (নূর) - সাদৃশ্য থেকে রূপক অর্থে উত্তরণ

সূরা নূর ২৪:৩৫

اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

অনুবাদ: আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর নূর।

এখানে “নূর” শব্দটি আলোর সাথে সাদৃশ্য রাখে। কিন্তু আল্লাহ কোনো ভৌত আলো নন। যদি আক্ষরিক আলো বোঝানো হয়, তবে সংঘর্ষ হয় -

সূরা শূরা ৪২:১১

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ

অনুবাদ: তাঁর মতো কিছুই নেই।

অতএব এখানে সাদৃশ্য ধরে রাখা হয়, কিন্তু অর্থ নেওয়া হয় -

~হিদায়াত

~সত্য উদ্ভাসন

~পথনির্দেশ

💡 সারসংক্ষেপ ও বার্তা

এটি স্পষ্টভাবে রূপক (metaphor)।

"আল্লাহর হাত” - মুতাশাবিহ ও রূপক অপরিহার্যতা

সূরা ফাতহ ৪৮:১০

يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ

অনুবাদ: তাদের হাতের উপর আল্লাহর হাত রয়েছে।

হাত শব্দটি মানবদেহে একটি অঙ্গ। কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে শারীরিক অঙ্গ মানলে ৪২:১১-এর সাথে সংঘর্ষ হয়। এখানে “হাত” শব্দটি বোঝায় -

~ক্ষমতা

~কর্তৃত্ব

~অঙ্গীকারের নিশ্চয়তা

~সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ

💡 সারসংক্ষেপ ও বার্তা

এটি রূপক ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়।

৩:৭ আয়াতের মুতাশাবিহ কেন পরীক্ষার বিষয়

সূরা আলে ইমরান ৩:৭

وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ

অনুবাদ: আর কিছু আয়াত রয়েছে মুতাশাবিহ।

এই আয়াত জানিয়ে দেয় - মুতাশাবিহ আয়াত এমন ভাষা ব্যবহার করে, যেখানে -

~প্রথম স্তরে সাদৃশ্য আছে

💡 সারসংক্ষেপ ও বার্তা

কিন্তু চূড়ান্ত অর্থ নির্ধারণে পুরো কুরআনের আলো প্রয়োজন।

যারা কেবল সাদৃশ্য আঁকড়ে ধরে, তারা বিভ্রান্ত হয়।

যারা ৪:৮২-এর নীতি মানে, তারা প্রয়োজন অনুযায়ী রূপক (metaphor) অর্থ গ্রহণ করে।

সুতরাং কুরআনের আলোকে সঙ্গত অবস্থান হলো -

~মুতাশাবিহ মানে সবসময় কেবল সাদৃশ্য নয়

~আবার মুতাশাবিহ মানেই সর্বত্র রূপকও নয়

বরং মুতাশাবিহ এমন ভাষাগত ক্ষেত্র, যেখানে সাদৃশ্য দিয়ে কথা শুরু হয়, কিন্তু অর্থ নির্ধারিত হয় কুরআনের সামগ্রিক সংগতিতে।

এই কারণে - ফলের ক্ষেত্রে সাদৃশ্যই যথেষ্ট। নূর, হাত, আরশ ইত্যাদির ক্ষেত্রে রূপক অপরিহার্য।

এভাবেই মুতাশাবিহকে বুঝলে কুরআনের কোনো আয়াত আরেক আয়াতের সাথে সংঘর্ষে যায় না। এটাই সূরা নিসা ৪:৮২-এর মর্মার্থ।

পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।